Tuesday, February 10, 2026

ভারতের ডিজিটাল পরিচয়ের ভবিষ্যৎ: নতুন আধার অ্যাপে সুযোগ–ঝুঁকি মুখোমুখি


ছবিঃ আধার (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা ‘আধার’কে আরও গভীরভাবে দৈনন্দিন ব্যক্তিগত ও বেসরকারি পরিসরে নিয়ে যাচ্ছে ভারত সরকার। নতুন একটি আধার অ্যাপ এবং অফলাইন যাচাই সুবিধা চালুর মাধ্যমে এই পরিচয় ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে, যা নিরাপত্তা, সম্মতি এবং তথ্য ব্যবহারের সীমা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

গত জানুয়ারির শেষ দিকে ভারত সরকারের অধীন ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অব ইন্ডিয়া (ইউআইডিএআই) নতুন এই উদ্যোগের ঘোষণা দেয়। এতে এমন একটি অ্যাপ যুক্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় আধার ডেটাবেসে সরাসরি যাচাই ছাড়াই পরিচয় প্রমাণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে চালু হচ্ছে অফলাইন ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা।

নতুন অ্যাপটিতে ব্যবহারকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত তথ্য শেয়ার করতে পারবেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ চাইলে শুধু নিজের বয়স নির্দিষ্ট সীমার বেশি—এমন তথ্য জানাতে পারবেন, পুরো জন্মতারিখ প্রকাশ না করেই। এই সুবিধা হোটেল, আবাসন এলাকা, কর্মক্ষেত্র, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কিংবা পেমেন্ট ডিভাইসের মতো বিভিন্ন সেবায় ব্যবহার করা যাবে। তবে আগের ‘এম-আধার’ অ্যাপটি আপাতত চালু থাকছে।

এ ছাড়া মোবাইল ওয়ালেটেও আধারের উপস্থিতি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে স্যামসাং ওয়ালেটে এই সুবিধা রয়েছে। সামনে গুগল ওয়ালেটে সংযুক্তির পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং অ্যাপল ওয়ালেটেও আধার যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

আইনশৃঙ্খলা ও আতিথেয়তা খাতেও এই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রচার চালাচ্ছে ইউআইডিএআই। গুজরাটের আহমেদাবাদ সিটি ক্রাইম ব্রাঞ্চ দেশটির প্রথম পুলিশ ইউনিট হিসেবে ‘পাঠিক’ নামের একটি অতিথি নজরদারি প্ল্যাটফর্মে আধারভিত্তিক অফলাইন যাচাই যুক্ত করেছে। এই প্ল্যাটফর্মটি হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোতে অতিথিদের তথ্য সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

নতুন অ্যাপটিকে ডিজিটাল ভিজিটিং কার্ড হিসেবেও তুলে ধরছে কর্তৃপক্ষ। বৈঠক কিংবা নেটওয়ার্কিংয়ের সময় কিউআর কোডের মাধ্যমে নির্বাচিত ব্যক্তিগত তথ্য আদান–প্রদান করা যাবে।

ইউআইডিএআই কর্মকর্তারা বলছেন, কাগজের ফটোকপি বা আধার কার্ডের স্ক্রিনশট ব্যবহারের ঝুঁকি কমাতেই অফলাইন ও সম্মতিভিত্তিক যাচাই পদ্ধতির দিকে যাওয়া হচ্ছে। এতে ব্যবহারকারীরা কোন তথ্য দেবেন, তা নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবেন।

পরিসংখ্যান বলছে, নতুন অ্যাপটি চালুর পর দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অ্যাপ স্টোর বিশ্লেষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিকে অ্যাপটি প্রকাশের পর অল্প সময়েই এটি পুরোনো এম-আধার অ্যাপকে ডাউনলোডের সংখ্যায় ছাড়িয়ে গেছে। আধার–সংক্রান্ত অ্যাপগুলোর মাসিক ডাউনলোড কয়েক মাসের মধ্যে প্রায় চার গুণ বেড়েছে।

বর্তমানে আধার ব্যবস্থার আওতায় ইস্যু করা পরিচয় নম্বরের সংখ্যা ১৪০ কোটির বেশি। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৫০ কোটি যাচাই কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি মূলত পেছনের দিকের একটি অবকাঠামো হিসেবে কাজ করলেও নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

তবে মানবাধিকার ও ডিজিটাল অধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, ভারতের তথ্য সুরক্ষা কাঠামো এখনো পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় বেসরকারি খাতে আধারের বিস্তার নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তারা বলছেন, ডেটা প্রোটেকশন বোর্ড গঠনের আগেই এই ব্যবস্থা চালু হওয়া উচিত হয়নি।

আইনজীবী ও অধিকারকর্মীরা আরও দাবি করছেন, আধার ডেটাবেসে ভুল তথ্য, নিরাপত্তা ত্রুটি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কার্যকর প্রতিকার ব্যবস্থার অভাব এখনো বড় সমস্যা। এসব কারণে বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বঞ্চনার শিকার হতে পারে।

এ ছাড়া নাগরিক সমাজের কিছু সংগঠন মনে করছে, অফলাইন যাচাই ব্যবস্থার মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আধারের ব্যবহার বাড়ানো হলে সুপ্রিম কোর্টের আগের রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাদের ভাষায়, এটি ‘আধার ক্রিপ’—অর্থাৎ ধীরে ধীরে জীবনের সব ক্ষেত্রে আধারকে অনিবার্য করে তোলা।

সব মিলিয়ে নতুন অ্যাপ, নীতিগত শিথিলতা এবং প্রযুক্তিগত সম্প্রসারণ আধারকে ভারতের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করছে। এই অভিজ্ঞতার দিকে নজর রাখছে বিশ্বের বিভিন্ন সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, যারা বড় পরিসরে ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থার সম্ভাবনা ও ঝুঁকি দুটোই বিবেচনা করছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন