Sunday, August 2, 2026

অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বাছাইয়ে নতুন কৌশলে বিএনপি


প্রতীকী ছবিঃ বিএনপি (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা 

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থী বাছাইয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। অতীতে রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য, দক্ষতা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতা নিয়ে পাওয়া নানা অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে এবার তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য, দক্ষ, প্রাজ্ঞ ও রাষ্ট্রনায়কসুলভ ব্যক্তিকে বেছে নিতে চায় দলটি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা ও সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইকে সামনে রেখে আজ শনিবার (১ আগস্ট) বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং সম্ভাব্য প্রার্থীর যোগ্যতা নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনেই দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সম্ভাবনা থাকায় রাজনৈতিক অঙ্গনে এরই মধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।

গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে এমন একজনকে বেছে নেওয়া হবে, যিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও শ্রদ্ধেয় হবেন। একই সঙ্গে তার মধ্যে দক্ষতা, প্রজ্ঞা এবং দেশের প্রতি দৃঢ় আনুগত্য থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কারণে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের ওপর দলের নেতাকর্মীদের আস্থা রয়েছে। সব দিক বিবেচনা করেই তিনি উপযুক্ত ব্যক্তিকে বেছে নেবেন বলে আশা প্রকাশ করেন রিজভী।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। এ সাক্ষাতের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।

দলীয় সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিএনপি মূলত তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে পারে। এগুলো হলো—দেশ ও দলের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা, রাষ্ট্র পরিচালনা ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা এবং সংকটময় পরিস্থিতিতে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা।

দলটির নেতারা মনে করছেন, রাষ্ট্রপতি পদটি কেবল আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সংকটের সময় রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই শুধু দলীয় আনুগত্য নয়, প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা, সাহস এবং সর্বজনগ্রাহ্যতাও বিবেচনায় রাখতে হবে।

অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিএনপির এক প্রবীণ নেতা বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতার অভাব ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে। এ কারণে এবার ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কম।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রশ্নে বিএনপির অতীত অভিজ্ঞতায় সাফল্য ও বিতর্ক—দুই ধরনের ঘটনাই রয়েছে।

১৯৯৬ সালের মে মাসে বিএনপি সরকারের সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসের ভূমিকা নিয়ে দলটির নেতারা এখনো ইতিবাচক মূল্যায়ন করেন। সে সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের অভ্যুত্থানচেষ্টা প্রতিহত করতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

অন্যদিকে, ২০০৬ সালে বিএনপির মেয়াদ শেষে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে তার ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। ওই সময়ের সংকটের ধারাবাহিকতায় দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং এক-এগারোর রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিএনপির অনেক নেতা মনে করেন, সে সময়ের সিদ্ধান্ত ও পরিস্থিতির প্রভাব শেষ পর্যন্ত দলটির জন্য অনুকূল হয়নি।

এ ছাড়া ২০০১ সালের নির্বাচনের পর অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে রাষ্ট্রপতি করা হয়। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বিএনপির সঙ্গে তার রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়। কয়েকটি রাজনৈতিক ও দলীয় ইস্যুতে মতপার্থক্যের জেরে ২০০২ সালের জুনে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

দলটির নেতাদের মতে, এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়—শুধু আনুগত্য কিংবা ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা নয়, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সংকট মোকাবিলার যোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, রাষ্ট্রপতি পদে অতীতের ধারার বাইরে একজন যোগ্য, সৎ, মর্যাদাসম্পন্ন ও সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিকে বেছে নেওয়া প্রয়োজন।

তার মতে, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান নাগরিক। তাই এ পদে এমন একজন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত, যার ব্যক্তিগত সততা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার সক্ষমতা রয়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, কেবল দলীয় বা রাজনৈতিক হিসাবের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা সমীচীন নয়। সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত হলেও জাতীয় সংকট বা জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপ্রধানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তার মতে, রাষ্ট্রপতি পদে এমন একজন ব্যক্তিত্ব প্রয়োজন, যিনি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবেন এবং কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবেন না।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, রাষ্ট্রপতি এমন একজন হওয়া উচিত, যিনি প্রকৃত অর্থে দেশের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারবেন। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের ক্ষেত্রে জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো বিবেচনার কথাও উল্লেখ করেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ক্ষমতাসীন বিএনপির রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে। কারণ, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা শুধু সরকারের ভাবমূর্তিই নয়, দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনআস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দেশে ২২ জন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে পদত্যাগ করতে হয়েছে এবং কয়েকজনের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির সততা, যোগ্যতা, সাহস, সাংবিধানিক জ্ঞান ও সর্বজনগ্রাহ্যতা—সবগুলো বিষয়ই গুরুত্ব পাচ্ছে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, অতীতের সাফল্য ও ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এবার রাষ্ট্রপতি পদে এমন একজনকে মনোনয়ন দিতে চায় বিএনপি, যিনি একই সঙ্গে দল ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীল, রাজনৈতিকভাবে বিচক্ষণ এবং জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য হবেন। সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আজকের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন