- ০৩ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও শিক্ষার স্বপ্ন ছাড়েনি গাজার শিক্ষার্থীরা। এরই এক অনন্য উদাহরণ দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের মুসা পরিবারের তিন ভাই-বোন। চলমান সংঘাতের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও উচ্চ মাধ্যমিক সমমানের তাওজিহি পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফল করে তারা পরিবারকে এনে দিয়েছে গর্বের মুহূর্ত।
গত ২৪ জুলাই প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, একই পরিবারের তিন ভাই-বোন সামা, আবদুল্লাহ ও নাদা মুসা সবাই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের মধ্যে সামা পেয়েছে ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ নম্বর, আবদুল্লাহর ফলাফল ৯৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং নাদা পেয়েছে ৯৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
সামা জানান, এই সাফল্যের পথ ছিল অত্যন্ত কঠিন। যুদ্ধের ভয়াবহতা, মানসিক চাপ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।
তিনি বলেন, “পরিস্থিতি আমাদের জন্য সহজ ছিল না। অনেক সময় মনে হয়েছে আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু পরিবারের জন্য ভালো কিছু করার ইচ্ছা আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।”
মুসা পরিবারের আবদুল্লাহ ও নাদা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নিয়মিত কোচিং বা ব্যক্তিগত শিক্ষকের কাছে যেতে পারেনি। তাই পরিবারের উদ্যোগে শিক্ষকদের বাড়িতে এনে তাদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়।
তাদের মা হিন্দ মুহান্না বলেন, সন্তানদের আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পরিবার সবসময় পাশে ছিল।
তিনি বলেন, “আমরা সবসময় তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে তারা অন্যদের মতোই সক্ষম। তাদের আত্মবিশ্বাসই আজকের সাফল্যের বড় কারণ।”
নাদা মুসাও তার বাবা-মায়ের সহযোগিতাকে সাফল্যের মূল শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে। তার ভাষায়, পরিবারের সমর্থন না থাকলে এত কঠিন পরিস্থিতিতে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না।
গাজায় চলমান সংঘাত শিক্ষাব্যবস্থাকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। হাজারো শিক্ষার্থী ঘরবাড়ি হারিয়েছে, স্কুল ধ্বংস হয়েছে, অনেককে আশ্রয়কেন্দ্র বা অস্থায়ী তাঁবুতে বসে পড়াশোনা করতে হয়েছে।
ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা থেকে প্রায় ৮৯ হাজার শিক্ষার্থী তাওজিহি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে গাজা থেকেই অংশ নেয় প্রায় ৩৬ হাজার ৯০০ শিক্ষার্থী।
তবে যুদ্ধের কারণে বহু শিক্ষার্থী শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে অসংখ্য স্কুল ও শিক্ষা অবকাঠামো। জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজার অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেক শিক্ষক। মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকার গণিত শিক্ষক হানা আল-সাইয়েদ তাওজিহি পরীক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়িয়েছেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, মানসিক সমর্থনেরও প্রয়োজন ছিল।
“তারা শুধু শিক্ষক চায়নি, তারা এমন একজনকে চেয়েছে যে তাদের কথা শুনবে এবং পাশে থাকবে,” বলেন তিনি।
যুদ্ধের কারণে অনেক শিক্ষার্থী স্বজন হারানোর কষ্ট নিয়েও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে। তারপরও ভবিষ্যতের আশায় তারা পড়াশোনা চালিয়ে গেছে।
তবে গাজার সব শিক্ষার্থীর সাফল্যের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর বেদনা। মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের শিক্ষার্থী তালা আবু সুক্কার তাওজিহি পরীক্ষায় ৮৬ শতাংশ নম্বর পেয়েছেন। কিন্তু তার এই সাফল্যের দিনে পাশে ছিলেন না পরিবারের অনেক সদস্য।
যুদ্ধের সময় তিনি হারিয়েছেন বাবা, ভাই, বোন ও পরিবারের অন্য সদস্যদের। এত শোকের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে সফল হয়েছেন তিনি।
তালা বলেন, “আমি অনেক প্রিয় মানুষকে হারিয়েছি। কিন্তু তাদের স্মৃতিই আমাকে শক্তি দিয়েছে। আমি চেয়েছি এমন কিছু করতে, যা আমার পরিবারকে গর্বিত করবে।”
গাজার শিক্ষার্থীদের এবারের তাওজিহি ফলাফল শুধু একাডেমিক সাফল্যের গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি। ধ্বংস, শোক আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা দেখিয়েছে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও ভবিষ্যতের স্বপ্নকে সহজে দমিয়ে রাখা যায় না।
গাজার শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন শুধু পড়াশোনার জায়গা নয়, বরং বেঁচে থাকার আশা ও নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার প্রতীক হয়ে উঠেছে।