Monday, August 3, 2026

গবেষণায় অনিয়মের অভিযোগে গোবিপ্রবি-সংশ্লিষ্ট ৬ গবেষণাপত্র প্রত্যাহার


প্রতীকী ছবিঃ গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। গোপালগঞ্জ

তথ্য ও ফলাফলে অসংগতি, গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, ভুয়া বা প্রভাবিত পিয়ার রিভিউ, সন্দেহজনক প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা কম্পিউটার-সৃষ্ট কনটেন্টের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের অভিযোগে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি) সংশ্লিষ্ট ছয়টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রগুলোর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের নাম রয়েছে দুটি গবেষণাপত্রে। বাকি গবেষণাপত্রগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন সাবেক শিক্ষার্থীর নাম পাওয়া গেছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র প্রত্যাহারসংক্রান্ত তথ্য ও সম্পাদকীয় নোটিশ সংরক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম ‘রিট্রাকশন ওয়াচ’-এর তথ্যভান্ডার পর্যালোচনায় সম্প্রতি এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রকাশকদের দেওয়া প্রত্যাহার নোটিশে গবেষণাপত্রগুলো সরিয়ে নেওয়ার পেছনে একাধিক গুরুতর অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তথ্য ও গবেষণালব্ধ ফলাফলের অসংগতি, ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ, ভুয়া বা প্রভাবিত বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, অপ্রাসঙ্গিক তথ্যসূত্রের ব্যবহার, সাইটেশন কারসাজি, এআই বা কম্পিউটার-তৈরি কনটেন্টের অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ এবং গবেষণাপ্রক্রিয়ায় তৃতীয় পক্ষের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ।

তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ২০ জুন পর্যন্ত সময়ে গোবিপ্রবি-সংশ্লিষ্ট ছয়টি গবেষণাপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়। গবেষণাপত্রগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে প্রকাশিত হয়েছিল।

গবেষণাপত্রগুলো প্রকাশের সময় বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরবিপ্রবি)। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়।

প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রগুলোর বিষয়ভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, গণিত বিভাগের দুটি, বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের দুটি, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দুটি এবং ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একটি গবেষণাপত্র এতে সংশ্লিষ্ট। এর মধ্যে একটি গবেষণাপত্র বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের যৌথ গবেষণা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল।

রিট্রাকশন নোটিশগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ছয়টি গবেষণাপত্রের মধ্যে পাঁচটিতে তথ্য ও গবেষণার ফলাফল নিয়ে অসংগতি এবং ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নকে প্রত্যাহারের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া তিনটি গবেষণাপত্রে ভুয়া বা প্রভাবিত পিয়ার রিভিউ এবং এআই বা কম্পিউটার-সৃষ্ট কনটেন্টের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। দুটি গবেষণাপত্রের ক্ষেত্রে সন্দেহজনক প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ও তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

তালিকা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারিয়া আহমেদ শামির নাম রয়েছে দুটি প্রত্যাহারকৃত গবেষণাপত্রে। ‘Notion of Complex Spherical Fuzzy Graph with Application’ এবং ‘The Reformulated F-Index of Vertex and Edge F-Join of Graphs’ শীর্ষক গবেষণাপত্র দুটি প্রত্যাহারের নোটিশে অপ্রাসঙ্গিক তথ্যসূত্র ব্যবহার, তথ্য ও ফলাফলের অসংগতি, গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ, ভুয়া বা প্রভাবিত পিয়ার রিভিউ, এআই বা কম্পিউটার-সৃষ্ট কনটেন্টের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১৫–১৬ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী তানজিম ইশরাক রহমানের নাম রয়েছে দুটি প্রত্যাহারকৃত গবেষণাপত্রে।

‘COVID-19 in Bangladesh: Wave-centric Assessments and Mitigation Measures for Future Pandemics’ এবং ‘Advanced Implications of Nanotechnology in Disease Control and Environmental Perspectives’ শীর্ষক গবেষণাপত্র দুটি সন্দেহজনক প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়, তথ্য ও ফলাফলের অসংগতি এবং গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের কারণে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ রয়েছে।

এর মধ্যে ‘Advanced Implications of Nanotechnology in Disease Control and Environmental Perspectives’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের ২০১৫–১৬ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী দীপ্ত দে-এর নামও রয়েছে। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত।

অন্যদিকে, ‘Multifaceted Role of Natural Sources for COVID-19 Pandemic as Marine Drugs’ শীর্ষক গবেষণাপত্রটি তথ্য ও ফলাফলের অসংগতি, ফলাফলের অবিশ্বস্ততা এবং এআই বা কম্পিউটার-সৃষ্ট কনটেন্টের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের ২০১৬–১৭ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী শেখ সোহাগের নাম রয়েছে। তিনি বর্তমানে জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।

এদিকে, ‘The Experimental Significance of Isorhamnetin as an Effective Therapeutic Option for Cancer: A Comprehensive Analysis’ শীর্ষক গবেষণাপত্রটি সন্দেহজনক প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়, তথ্য ও ফলাফলের অসংগতি এবং গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এ গবেষণাপত্রে ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১৮–১৯ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী মো. হাসিবুল হাসানের নাম রয়েছে। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

গোবিপ্রবির রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আরেফিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ছয়টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে এবং বিষয়টি প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন কারণে কোনো গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হতে পারে। প্রত্যাহারের কারণগুলো যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই ছাড়া আগেভাগে কোনো মন্তব্য করা বা সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন হবে না।

তার ভাষ্য, আগে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুস সাদাত বলেন, গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিষয়টি জানার পর তিনি সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, যেসব শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষার্থীর গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রত্যাহারের কারণ জানার চেষ্টা করা হবে। তদন্তে কোনো ধরনের অসদুপায় বা অনিয়মের প্রমাণ মিললে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি ও নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তদন্তের উদ্যোগের পর সংশ্লিষ্ট গবেষণাগুলোতে উত্থাপিত অভিযোগের প্রকৃতি এবং এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন