- ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ইয়েমেনে কয়েক বছরের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর আবারও ভয়াবহ সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। হুথি বিদ্রোহী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া তীব্র লড়াইয়ে মাত্র এক সপ্তাহেই অন্তত ৪৬ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে দেশটির তাইজসহ কয়েকটি সংঘাতপ্রবণ এলাকা। শুক্রবার হুথিরা মোখা দখলে নেওয়ার পাশাপাশি লোহিত সাগরের উপকূলের নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা শেষ অংশটুকুও নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর পর সরকার নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং নতুন করে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি শুরু হয়।
তাইজের আল-কাদাহা এলাকার একটি শিবিরে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাস্তুচ্যুত জীবন কাটাচ্ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব আমান মুরশেদ। বাড়িতে পরিবারের খামার ও গবাদিপশুর কাছে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কিন্তু নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই আশাও ভেঙে গেছে।
লড়াই শুরুর পর সন্তানদের নিয়ে ভোরে শিবির ছাড়তে বাধ্য হন আমান। কাছাকাছি কোনো গাড়ি না থাকায় দুই কিলোমিটারের বেশি পথ হেঁটে পরে একটি পিকআপে করে আল-মা'ফের জেলার আল-মালিকা শিবিরে পৌঁছান তিনি।
নতুন শিবিরে আত্মীয়স্বজন থাকলেও পরিবারের জন্য এখনো উপযুক্ত আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়নি। খাবারের সংকটও তীব্র। প্রতিবেশীদের দেওয়া খাবারের ওপর নির্ভর করেই দিন কাটছে তাঁদের।
অমানের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা, ফেলে আসা গবাদিপশুগুলো নিয়ে। আগেরবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার সময় কোনোভাবে পশুগুলো সঙ্গে নিতে পারলেও এবার তা সম্ভব হয়নি। তীব্র লড়াইয়ের মধ্যে সেগুলো মারা গেছে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
নিজের জন্য খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাবের চেয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন আমান। শিবিরে থাকা শিশুরা নিয়মিত শিক্ষা, পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, গত সপ্তাহে নতুন করে সংঘাত শুরুর পর ইয়েমেনে অন্তত ৪৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের বড় একটি অংশ তাইজের আল-মা'ফের এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছে।
তবে সেখানে থাকা শিবিরগুলোর ধারণক্ষমতা সীমিত। ফলে শত শত পরিবার সরু তাঁবুতে গাদাগাদি করে কিংবা তাঁবুর পাশেই কোনোভাবে রাত কাটাচ্ছে। অনেকে জায়গা না পেয়ে গাছের ছায়ায় দিনের সময় কাটাচ্ছেন।
তাইজে বাস্তুচ্যুত শিবির ব্যবস্থাপনার নির্বাহী ইউনিটের মহাপরিচালক আলী কায়েদ বলেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বেশির ভাগ বাস্তুচ্যুত মানুষ আল-মা'ফের এলাকায় চলে এসেছে। কিন্তু বিদ্যমান শিবিরগুলো এত বিপুলসংখ্যক নতুন মানুষের চাপ নেওয়ার মতো অবস্থায় নেই।
তিনি জানান, মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বয় চলছে। তবে বর্তমান সহায়তা কার্যক্রম প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত।
আল-মা'ফেরের আল-গাজালিয়া শিবিরে আশ্রয় নেওয়া চল্লিশোর্ধ্ব আহমেদ আবদুলজলিলের অভিজ্ঞতাও আমানের মতো। নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর শুক্রবার ভোরে জাবাল হাবাশি জেলার আগের আশ্রয়স্থল ছেড়ে পরিবার নিয়ে পালিয়ে আসেন তিনি।
তাঁর অভিযোগ, শিবিরে মানবিক সহায়তা সংস্থার উপস্থিতি এখনো পর্যাপ্ত নয়। নারী ও শিশুরা প্লাস্টিকের চাদরের নিচে রাত কাটাচ্ছেন, আর অনেক পুরুষকে খোলা আকাশের নিচে থাকতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র খাদ্যসংকট।
স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা পিস অ্যান্ড সোশ্যাল সিকিউরিটি অর্গানাইজেশনের আল-মা'ফের শাখার ব্যবস্থাপক আবদুলনাসের আল-সুরুরি জানান, নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢল নামার আগেই অর্থসংকটে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।
তাঁর ভাষ্য, বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর খাবার, আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রীসহ মৌলিক সেবার প্রয়োজন। কিন্তু সীমিত অর্থের কারণে সবাইকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
নতুন সংঘাতে বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে আহতও হয়েছেন অনেকে। জাবাল হাবাশি এলাকা থেকে পালানোর সময় বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ হন চল্লিশোর্ধ্ব মুনির। সংঘর্ষের মধ্যে অন্য পরিবারগুলোর সঙ্গে পালানোর সময় হঠাৎ গোলাগুলির মধ্যে পড়ে আহত হন তিনি।
হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেলেও এখনো লাঠির সাহায্যে হাঁটতে হচ্ছে তাঁকে। যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নিয়ে হতাশ মুনিরের একটাই চাওয়া লড়াই থামুক, মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারুক।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানী সানা দখলের পর থেকেই ইয়েমেনে হুথি ও সরকারপন্থী বাহিনীর সংঘাত চলে আসছে। ২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর বড় ধরনের লড়াই অনেকটা থেমে যায়। যদিও এ সময়ে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ও আঞ্চলিক উত্তেজনা অব্যাহত ছিল।
চলতি মাসে শুরু হওয়া নতুন লড়াইকে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র সংঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মধ্যে লোহিত সাগর ঘিরে উত্তেজনাও নতুন মাত্রা পেয়েছে।
গাজা যুদ্ধের সময় ইয়েমেন উপকূল দিয়ে চলাচলকারী বেশ কয়েকটি জাহাজে হুথিদের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সংগঠনটির বিভিন্ন অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছিল। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের সময়ও হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ওই অঞ্চলে কয়েকটি জাহাজ ও সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে।
তাইজের সাংবাদিক মোহাম্মদ আলীর মতে, কয়েক বছর তুলনামূলক শান্ত থাকার পর ইয়েমেনের অনেক মানুষ যুদ্ধের অবসান ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশা করেছিলেন। বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলোচনাও চলছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাত সেই আশাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
এদিকে আল-জওফ, মারিব ও আল-বাইদা প্রদেশেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তীব্র লড়াই হয়েছে। এসব এলাকায়ও নতুন করে বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের দেশ ইয়েমেনে ২০২৬ সালে প্রায় ২ কোটি ২৩ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষা প্রয়োজন। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫২ লাখ।
ফলে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে পক্ষগুলোর লড়াই চললেও এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে ঘরবাড়ি হারানো সাধারণ মানুষ, নারী ও শিশুদের।