- ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তি ও সংগঠনের ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দেওয়া কিংবা ঋণসুবিধা প্রত্যাখ্যানের অভিযোগ নিয়ে যুক্তরাজ্যে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন ফিলিস্তিনপন্থী কর্মী, লেখক, রাজনীতিক ও সংবাদমাধ্যম ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
দক্ষিণ ওয়েলসের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এমা কামিও দাবি করেছেন, চলতি বছরের এপ্রিলে তাঁর বাণিজ্যিক সম্পত্তির পুনঃঅর্থায়নের আবেদন লয়েডস ব্যাংক প্রত্যাখ্যান করে। ব্যাংকের পক্ষ থেকে এর কারণ হিসেবে ‘অ্যাডভার্স মিডিয়া’ বা নেতিবাচক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের কথা জানানো হয়েছিল বলে দাবি তাঁর।
কামিও বলেন, এই সিদ্ধান্ত তাঁকে মারাত্মকভাবে বিপাকে ফেলেছে। পারিবারিক ব্যবসায় নিজের দায়িত্ব কমিয়ে দিয়ে তাঁর বোনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হয়েছে। তবে ব্যবসার চেয়েও এখন তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারাগারে থাকা মেয়েকে মুক্ত করা।
কামিওর মেয়ে লিওনা ‘এলি’ কামিও প্যালেস্টাইন অ্যাকশন সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার মামলায় কারাবন্দী। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিচার শুরুর অপেক্ষায় আটক থাকা অবস্থায় তাঁর ব্যাংক হিসাবও লয়েডস বন্ধ করে দিয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। ব্যাংকটি তখনও অ্যাকাউন্ট বন্ধের সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করেনি।
এদিকে স্কটিশ রাজনীতিক ও সম্প্রচারক জর্জ গ্যালোওয়ে গত সপ্তাহে অভিযোগ করেন, ৩৯ বছর ধরে ব্যবহৃত তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব ব্যাংক অব স্কটল্যান্ড কোনো ব্যাখ্যা বা আগাম নোটিশ ছাড়াই বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি জানান, তাঁর সংসদীয় ও অবসরকালীন ভাতার অর্থ ওই হিসাবে জমা হতো এবং পারিবারিক বাড়ির ঋণের কিস্তিও সেখান থেকেই পরিশোধ করা হতো।
জুনের শেষদিকে বামপন্থী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ক্যানারি’ও লয়েডসের কাছ থেকে একই ধরনের পদক্ষেপের কথা জানায়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, একাধিকবার যোগাযোগের পরও ব্যাংকটি অ্যাকাউন্ট বন্ধের কারণ ব্যাখ্যা করেনি।
এরপর বুধবার পাকিস্তানি-ব্রিটিশ লেখক তারিক আলীও অভিযোগ করেন, একটি ব্যাংক তাঁর ‘মতামতের’ কারণে তাঁর হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তর গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কোন ব্যাংকের কথা তিনি বলছেন, তা অবশ্য প্রকাশ করেননি। তাঁর দাবি, ‘মতামত’ বলতে ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাঁর অবস্থানকেই বোঝানো হয়েছে।
প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে যুক্তরাজ্য সরকার ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করার আগেই এলি কামিওর ব্যাংক হিসাব বন্ধ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে, ২০২৪ সালের আগস্টে ব্রিস্টলের ফিলটনে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এলবিট পরিচালিত একটি কারখানায় হামলার ঘটনায় অপরাধমূলক ক্ষয়ক্ষতির মামলায় তাঁর সাজা হওয়ারও আগে ব্যাংকটি এই সিদ্ধান্ত নেয় বলে দাবি করা হয়েছে।
প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের চার সদস্য, যাঁদের মধ্যে কামিওও রয়েছেন, তাঁদের কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। তাঁদের আইনজীবীদের যুক্তি, অপরাধমূলক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করে বিচারকের সিদ্ধান্ত নেওয়া আইনের দৃষ্টিতে সঠিক হয়নি।
সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর থেকে এর সমর্থনে আয়োজিত বিক্ষোভ ও সমাবেশে অংশ নেওয়ার অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে লয়েডস ব্যাংক বলেছে, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ভিত্তিতে তারা কোনো গ্রাহকের হিসাব বন্ধ করে না কিংবা ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় না। ব্যাংকের ভাষ্য, প্রযোজ্য আইন, বিধিবিধান, হিসাবের শর্ত এবং ঋণ প্রদানের প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ব্যক্তিগত গ্রাহকের বিষয়ে অবশ্য মন্তব্য করতে রাজি হয়নি প্রতিষ্ঠানটি।
যুক্তরাজ্যে ‘ডিব্যাংকিং’ নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। অধিকারকর্মী ও বিভিন্ন সংগঠনের অভিযোগ, রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা বিতর্কিত হিসেবে বিবেচিত অবস্থানের কারণে ব্যাংকিং সুবিধা হারানোর ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে।
সন্ত্রাসবিরোধী নীতির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কাজ করা সংগঠন কেজের কর্মকর্তা আনাস মুস্তাফা বলেন, ফিলিস্তিনপন্থী কণ্ঠস্বরকে ব্যাংকিং সেবা থেকে বাদ দেওয়ার প্রবণতা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং তা একটি ব্যবস্থাগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তাঁর দাবি, কেজও এক দশকের বেশি সময় আগে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ব্যাংকিং সেবা হারিয়েছিল।
ডিব্যাংকিং ইস্যুটি ২০২৩ সালেও ব্যাপক আলোচনায় আসে। সে সময় যুক্তরাজ্যের মুসলিম ব্যক্তি ও সংগঠনের পাশাপাশি রিফর্ম পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজও ব্যাংক হিসাব বন্ধের অভিযোগ তুলেছিলেন।
লন্ডনভিত্তিক কোরডোবা ফাউন্ডেশনের প্রধান আনাস আলতিকরিতি দাবি করেন, ব্যাংকিং সেবা প্রত্যাহারকে অনেক ক্ষেত্রে ‘দমন-পীড়নের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক ব্যাংক হিসাব বন্ধ হয়ে গেলেও এসব সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ নিয়ে স্বচ্ছতা থাকে না।
আলতিকরিতির নিজের নামও একসময় একটি ব্যাংকিং ডেটাবেজে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি অভিযোগের ভিত্তিতে এমন পরিচিতি যুক্ত করা হলেও যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ তা স্বাধীনভাবে যাচাই করেনি।
তাঁর মতে, ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটির ব্যবহার এখন অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বা বিতর্কিত মতামতের ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো ব্যক্তির নামের সঙ্গে এমন একটি পরিচিতি যুক্ত হলে তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ব্যাংকিংসহ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
আলতিকরিতি বলেন, কোনো ব্যক্তিকে একবার এমনভাবে চিহ্নিত করা হলে সেই তথ্য দীর্ঘদিন রেকর্ডে থেকে যেতে পারে। ফলে এর প্রভাব শুধু একটি ব্যাংক হিসাব বন্ধ হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং ব্যক্তির পুরো আর্থিক ও সামাজিক জীবনে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক উত্তেজনা ও প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ‘ডিব্যাংকিং’ নিয়ে নতুন এসব অভিযোগ তাই দেশটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যাংকিং সেবা এবং রাজনৈতিক অবস্থানের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছে।