Thursday, September 10, 2026

ইয়েমেনে একাধিক ফ্রন্টে তীব্র লড়াই, দুই সপ্তাহে নিহত ১৯৪


ছবিঃ এ প্রকাশিত একটি ভিডিও থেকে নেওয়া এই স্থিরচিত্রে ইয়েমেনের আল-হাজম এলাকার কাছাকাছি স্থানে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাথে সংঘর্ষের সময় সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর সদস্যদের দেখা যাচ্ছে। (সংগৃহীত । আল জাজিরা /হ্যান্ডআউট/রয়টার্সের মাধ্যমে ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর মিডিয়া সেন্টার)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের মধ্যে নতুন করে তীব্র লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির উত্তর, পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্টে বিমান হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের খবর পাওয়া গেছে।

ত্রাণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহের সংঘাতে তাইজ, পশ্চিম উপকূল, আল-জাওফ, মারিব ও ধালেয়া অঞ্চলে অন্তত ১৯৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৮৮০ জন।

এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার হুতিদের মোখা শহর দখলের খবর পাওয়া গেছে। লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত এ শহরটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছাকাছি অবস্থানের কারণে মোখার নিয়ন্ত্রণ লোহিত সাগরের সামুদ্রিক যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী অন্যদিকে তাইজে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি তেলসমৃদ্ধ মারিবে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী আল-জাওফ এবং হুতিদের নিয়ন্ত্রিত উত্তরাঞ্চল ও সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন দক্ষিণাঞ্চলের সংযোগস্থল ধালেয়াতেও সংঘর্ষ তীব্র হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব ফ্রন্টের যেকোনো একটিতে বড় ধরনের সাফল্য বা পরাজয় যুদ্ধরত পক্ষগুলোর সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।

সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষণা ব্যবস্থাপক ইয়াজিদ আল-জেদ্দাউইয়ের মতে, তাইজ ও পশ্চিম উপকূলের পাহাড়ি এলাকাগুলো হুতিদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এসব এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারা উঁচু কৌশলগত অবস্থান দখল, সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন এবং উপকূলীয় মোখার সঙ্গে তাইজের যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

তাইজ থেকে মোখার দিকে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও উঁচু এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ এখন দুই পক্ষের সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।

বাব আল-মান্দাব প্রণালি থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে মোখার অবস্থান। গত মাসে শহরটির বন্দর ও আশপাশের এলাকায় হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এতে বেসামরিক লোকজনও হতাহত হন। পরে শহরটির দিকে স্থল অভিযানও জোরদার করে হুতিরা।

বিশ্লেষকদের ধারণা, মোখার নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করে হুতিরা ধুবাব ও বাব আল-মান্দাব এলাকার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এমন অগ্রগতি হলে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথের কাছে তাদের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী হবে এবং আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বাড়বে।

ইয়েমেনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক ফুয়াদ মুস্যেদের মতে, পশ্চিম উপকূল ও তাইজের গুরুত্বের মূল কারণ তাদের বাব আল-মান্দাবের নিকটবর্তী অবস্থান। লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।

তার মতে, এই জলপথের কাছাকাছি অবস্থান তৈরি করতে পারলে হুতিরা সামুদ্রিক বাণিজ্যকে চাপের মধ্যে রাখার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাতে ইরানের কৌশলগত প্রভাবও বাড়তে পারে।

এরই মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে সেটিকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তেহরান সতর্ক করে দিয়েছে, তাদের মিত্ররাও বাব আল-মান্দাব দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে। জুলাইয়ে হুতিরাও লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী সৌদি জাহাজকে লক্ষ্য করে অবরোধের ঘোষণা দেয়।

ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ঘাঁটি মারিব নিয়েও দুই পক্ষের সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে সরকারি বাহিনী হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অভিযান চালিয়েছে। জবাবে পাল্টা হামলা চালিয়েছে হুতিরাও।

ইয়েমেনি রাজনৈতিক ভাষ্যকার সাদ্দাম আল-হুরাইবি বলেন, মারিবের লড়াই দুই পক্ষের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অঞ্চলটি সরকারের উত্তরাঞ্চলীয় উপস্থিতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

হুতিরা মারিবের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে উত্তর ইয়েমেনে তাদের কর্তৃত্ব আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে অঞ্চলটির তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে। ২০১৪ সালে রাজধানী সানাসহ উত্তর ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নিলেও মারিব এখনো সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

মারিবের পাশের আল-জাওফেও সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে। সেখানে সরকারি বাহিনী সাফল্য পেলে মারিবের ওপর হুতিদের চাপ কমানো এবং উত্তর দিকে আরও অগ্রসর হওয়ার পথ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে হুতিরা প্রতিরোধ ধরে রাখতে পারলে সরকারি বাহিনীর ওপর চাপ বাড়বে এবং তাদের মনোবলেও প্রভাব পড়তে পারে।

আল-জেদ্দাউইয়ের মতে, আল-জাওফে সরকারি বাহিনীর অগ্রগতি তাদের সৌদা, আমরানসহ আরও উত্তরের হুতিঘাঁটির দিকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

হুতিদের নিয়ন্ত্রিত উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণের সরকারি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ ধালেয়াতেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লড়াই বেড়েছে।

২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনের অনেক এলাকায় তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি তৈরি হলেও ধালেয়ায় সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বর্তমানে সেখানে আবারও বড় ধরনের সামরিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে।

ধালেয়ায় হুতিরা অগ্রসর হতে পারলে দক্ষিণের আরও কয়েকটি এলাকায় যাওয়ার পথ খুলে যেতে পারে। বিপরীতে সরকারি বাহিনী সাফল্য পেলে হুতিদের নিয়ন্ত্রিত ইব্বের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পাবে।

আল-জেদ্দাউই বলেন, ধালেয়ায় হুতিদের অগ্রগতি দক্ষিণাঞ্চলের ভেতরের এলাকাগুলোকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। আর সরকারি বাহিনী এগিয়ে গেলে ইব্ব, আল-বাইদা এবং আরও উত্তরে সানার দিকে হুতিদের সরবরাহপথ ও অবস্থান হুমকির মুখে পড়তে পারে।

একাধিক ফ্রন্টে চাপের মুখে থাকলেও হুতিরা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত রেখেছে বলে দাবি করেছেন গোষ্ঠীটির ঘনিষ্ঠ জেনারেল খালেদ ঘোরাব।

তার ভাষ্য, স্থল, সমুদ্র ও আকাশ তিন দিক থেকে একযোগে বড় ধরনের হামলার সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখেই হুতিরা সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। প্রয়োজনে শত্রুপক্ষের ভূখণ্ডের গভীর অঞ্চল কিংবা সমুদ্রেও হামলা চালানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার পেছনে শুধু স্থানীয় ক্ষমতার লড়াই নয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সানা সেন্টারের গবেষক আল-জেদ্দাউইয়ের মতে, ইরানের জন্য ইয়েমেন ও লোহিত সাগরকে সক্রিয় সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে ধরে রাখা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ইয়েমেনের সরকারি শিবিরের একটি অংশ মনে করছে, হুতিরা বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে এবং এ পরিস্থিতি তাদের সামরিক শক্তি দুর্বল করার সুযোগ তৈরি করেছে।

ফলে ইয়েমেনের বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান লড়াই স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামরিক হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন