Thursday, September 10, 2026

নেপালের বন্যায় নিশ্চিহ্ন শহর, স্বজন হারিয়ে ফিরলেন বিহারের দুই শ্রমিক


ছবিঃ উত্তর নেপালের একটি হোটেলে খাট তৈরির সময় ৩৪ বছর বয়সী আরমান আনসারি বন্যার তোড়ে ভেসে যান। তখন থেকেই তিনি নিখোঁজ। (সংগৃহীত । আল জাজিরা /জ্যোতি যাদব/আল জাজিরা)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

নেপালের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সীমান্তবর্তী পাহাড়ি শহর সিয়াফ্রুবেসি। গত ২৬ আগস্টের সেই ভয়াল দিনে শহরটির বিভিন্ন নির্মাণস্থলে কাজ করছিলেন ভারতের বিহারের কয়েকজন অভিবাসী শ্রমিক। কেউ রান্নাঘরের কাজ করছিলেন, কেউ বিছানা তৈরির শেষ কাজটুকু করছিলেন। হঠাৎ পাহাড় কাঁপিয়ে নেমে আসা পানির স্রোত তাদের কর্মস্থল, বসতঘর ও পরিচিত শহরটিকেই গ্রাস করে নেয়।

বন্যার পর এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০০টির বেশি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ৪ হাজার মানুষ। উদ্ধার করা হয়েছে ১৩ হাজারের বেশি মানুষকে। নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন বিহারের বেত্তিয়া জেলার তুরহাপাট্টি গ্রামের তিন শ্রমিক—আরমান আনসারি, সামির আনসারি ও মুখতার আনসারি।

তবে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন একই গ্রামের দুই শ্রমিক নেয়াজ মিয়া (৩৪) ও মেহেদি হাসান (৩৪)। ভয়াবহ সেই দিনের স্মৃতি এখনো তাদের তাড়া করে ফিরছে।

নেয়াজ মিয়া সিয়াফ্রুবেসির একটি আধা নির্মিত বাড়িতে কাজ করছিলেন। অন্যদিকে মেহেদি হাসান ছিলেন গণেশ হোটেলের নিচতলায়। হঠাৎ বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে ওঠে। আকাশ যেন অন্ধকার হয়ে আসে। পরিস্থিতি বুঝে নেয়াজ মোবাইল ফোন ও স্যান্ডেল নিয়ে দ্রুত পাহাড়ের দিকে ছুটে যান। মেহেদি তখন আর কোনো কিছু নেওয়ার কথা ভাবেননি; প্রাণ বাঁচাতে সিঁড়ির মতো সরু পথ ধরে ওপরে উঠতে থাকেন।

পাহাড়ের প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে গিয়ে দুজনের দেখা হয়। সেখানে আরও ৬০ থেকে ৭০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বুঝতে পারেন, নিচের পুরো শহর ভয়াবহ পানির স্রোতে তলিয়ে যাচ্ছে।

প্রায় এক দশক আগে কাঠমিস্ত্রির কাজ নিয়ে নেপালের এই শহরে এসেছিলেন নেয়াজ। কয়েক বছর পর মেহেদিকেও সেখানে নিয়ে আসেন তিনি। দুজন মিলে শহরের বিভিন্ন হোটেল ও বাড়িতে আসবাবপত্র, রান্নাঘর, খাট ও আলমারি তৈরির কাজ করতেন। যে শহরের ভবনগুলোর ভেতরের সাজসজ্জা তারা তৈরি করেছিলেন, সেদিন চোখের সামনে সেসবই পানির সঙ্গে ভেসে যেতে দেখেন।

নেয়াজের ভাষায়, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই শহরটি যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। তাঁর ধারণা, শহরের ২ হাজার ২৭১ বাসিন্দার মধ্যে মাত্র কয়েক শ মানুষ হয়তো বেঁচে থাকতে পেরেছেন।

বন্যার সময় তাদের সঙ্গে ছিলেন আরমান, সামির ও মুখতার। আরমানের ১৪ বছরের ছেলে সালমান আলম এবং তার বন্ধু ১৭ বছরের শিবু আলমও ওই এলাকায় ছিলেন। তারা পাহাড় দেখতে এক মাস আগে বাবার সঙ্গে নেপালে এসেছিল।

বন্যার সকালে আরমান গণেশ হোটেলের নিচতলায় মেহেদির সঙ্গে কাজ করছিলেন। সামির ও মুখতার ছিলেন ফুল মুন হোটেলের ওপরের তলায়। মেহেদি যখন দৌড়ে পাহাড়ের দিকে উঠছিলেন, তখন তাঁর ধারণা ছিল আরমানও পেছনে আসছেন। কিন্তু পরে আরমান, সামির ও মুখতার কাউকেই আর দেখা যায়নি।

পাহাড়ে গিয়ে নেয়াজ ও মেহেদি আতঙ্কিত অবস্থায় সালমান ও শিবুকে দেখতে পান। বাবাকে হারিয়ে সালমান তখন কাঁদছিল এবং চারদিকে তাঁকে খুঁজছিল।

বন্যার পানি প্রায় আধা ঘণ্টা পর কমতে শুরু করলে নেয়াজ, মেহেদি ও দুই কিশোর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিখোঁজদের খুঁজতে নিচে নামেন। কিন্তু সেখানে ছিল কেবল কাদা, ধ্বংসাবশেষ আর পানির চিহ্ন। নেয়াজের কাঠের কাজের সরঞ্জাম ও মেশিনও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে। প্রায় ৮০ হাজার নেপালি রুপি মূল্যের এসব সরঞ্জামই ছিল তাঁর কাজের প্রধান অবলম্বন।

পরদিন উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারে করে তাদের নিরাপদ এলাকায় নেওয়া হয়। পরে কয়েকজন ভারতীয় শ্রমিক মিলে গাড়ি ভাড়া করে কাঠমান্ডুতে পৌঁছান। সেখান থেকে সীমান্তবর্তী বিরগঞ্জ হয়ে পায়ে হেঁটে ভারতীয় সীমান্ত পার হন তারা। এরপর বাসে নিজ নিজ গ্রামে ফিরে যান।

তুরহাপাট্টিতে ফিরে এলেও নিখোঁজ তিন শ্রমিকের পরিবারগুলোর অপেক্ষা শেষ হয়নি।

আরমানের স্ত্রী সাহরুন খাতুন এখন স্বামীর শেষ ফোনকলের স্মৃতি আঁকড়ে আছেন। বন্যার প্রায় দুই ঘণ্টা আগে তাঁদের কথা হয়েছিল। ১ সেপ্টেম্বর বেতন নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল আরমানের। সেই ফেরা আর হয়নি।

আরমানের ছেলে সালমানও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছে না। ঘুমাতে গেলেই তার মনে হয় আবারও বন্যার পানি ধেয়ে আসছে।

মুখতার আনসারির পরিবারের সদস্যরাও দিনের পর দিন তাঁর সন্ধান করে চলেছেন। তাঁর বড় ছেলে ওসামা কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে বাবার খোঁজ করেছেন। শেষ পর্যন্ত নিখোঁজদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় নিজের ডিএনএ নমুনাও দিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে সামির আনসারি ছিলেন নিখোঁজ তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী। তিনি মার্বেল টাইলস বসানোর কাজে দক্ষ ছিলেন। নেপালের যে ভবনে কাজ করছিলেন, সেটির কাজ শেষ হতে তখনও মাত্র কয়েক দিন বাকি ছিল।

তিন পরিবারের সদস্যরা এখন অনেকটাই আশা ছেড়ে দিয়েছেন। নিখোঁজ স্বজনদের মরদেহ না পেলেও শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।

তুরহাপাট্টি গ্রামের গল্প আসলে ভারতের সীমান্তবর্তী হাজারো গ্রামের গল্পের মতোই। কাজের অভাবে এ গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকেই কেউ না কেউ দেশের অন্য শহর কিংবা বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। কেউ কাশ্মীরে, কেউ নেপালে, আবার কেউ দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা কিংবা চেন্নাইয়ে কাজ করেন। অনেকে পাড়ি দিয়েছেন উপসাগরীয় দেশগুলোতেও।

বিহারের শ্রমিকদের জন্য নেপালে কাজের অন্যতম আকর্ষণ তুলনামূলক বেশি মজুরি। ভারতে একজন কাঠমিস্ত্রি বা রাজমিস্ত্রি দৈনিক ৬০০ থেকে ৭০০ রুপি আয় করলেও নেপালে একই কাজের জন্য প্রায় ৯০০ রুপি পাওয়া যায়। ফলে জীবিকার তাগিদে সীমান্ত পেরিয়ে নেপালে যাওয়া অনেকের কাছেই স্বাভাবিক পথ হয়ে উঠেছে।

নেয়াজও নেপাল থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৩০ হাজার ভারতীয় রুপি পরিবারের কাছে পাঠাতেন। মেহেদি হাসান স্ত্রী ও চার সন্তানের জন্য পাঠাতেন প্রায় ১৫ হাজার রুপি। দেশে নিয়মিত কাজের নিশ্চয়তা না থাকায় নেপালের আয়ই ছিল তাদের পরিবারের প্রধান ভরসা।

কিন্তু ভয়াবহ সেই বন্যা তাদের জীবনের হিসাব বদলে দিয়েছে। প্রাণে বেঁচে ফিরলেও নেয়াজ ও মেহেদি আবার পাহাড়ে কাজ করতে যেতে চান না। নতুন কাজের সন্ধান করছেন নেপালের সমতল এলাকায়।

মেহেদি বলেন, সিয়াফ্রুবেসির কথা মনে পড়লেই এখনো তাঁর শরীর শিউরে ওঠে। সেই পাহাড়ে আর ফিরতে চান না তিনি।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন