Wednesday, September 9, 2026

হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিলে দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘গুরুতর পরিণতির’ হুমকি ইরানের


ছবিঃ ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র সিউল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে রয়েছে (সংগৃহীত । আল জাজিরা / সং কিউং-সিওক/রয়টার্স)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়া সামরিকভাবে যুক্ত হলে দেশটিকে ‘গুরুতর পরিণতি’ ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ কার্যক্রমে দক্ষিণ কোরিয়া অংশ নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে—এমন খবরের মধ্যেই ইরানের পক্ষ থেকে এ হুঁশিয়ারি এলো।

সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দক্ষিণ কোরিয়াকে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, ইরান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এবং তেহরান এই সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক তৎপরতায় দক্ষিণ কোরিয়া যুক্ত হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হবে বলে সতর্ক করেন তিনি। বাঘাইয়ের ভাষ্য, ইরান যখন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষায় লড়ছে, সেই সময়ে কোনো দেশ উপসাগরীয় অঞ্চল বা হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উপস্থিতি কিংবা অভিযানে অংশ নিলে সেটিকে আগ্রাসী পক্ষকে সরাসরি সমর্থন হিসেবে বিবেচনা করবে তেহরান।

এ ধরনের পদক্ষেপের ‘গুরুতর পরিণতি’ হতে পারে বলেও সতর্ক করেন ইরানের এই কর্মকর্তা। একই সঙ্গে তিনি কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার আহ্বান জানান।

যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে কোনো ধরনের সহযোগিতা করবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য বিষয়টি কেবল কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।

দেশটির অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানির প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে। যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিতে এরই মধ্যে চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতিও বাড়ছে এবং দেশটির মুদ্রা উনের দর ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।

ইরান যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপও বাড়ছে বলে দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

আগস্টের মাঝামাঝি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের সঙ্গে ইরান যুদ্ধ নিয়ে কথা বলেছেন এবং যুদ্ধে ওয়াশিংটনকে কিছুটা সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে সিউল তখন সেই অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

এরপর দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়ার পরিধি কমিয়ে দেয় ওয়াশিংটন। ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ নামে পরিচিত বার্ষিক মহড়াটি সাধারণত ১১ দিনের বেশি সময় ধরে চললেও এবার তা পাঁচ দিনে সীমিত করা হয়।

এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় আরেকটি যৌথ মেরিন মহড়াও বাতিল করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এর কারণ হিসেবে ইরান যুদ্ধের কারণে সামরিক সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপের কথা জানানো হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথেই এগোচ্ছেন। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদ সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, হরমুজে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে সামরিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছে সিউল।

সম্ভাব্য সহযোগিতার মধ্যে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য মিত্র দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে যুদ্ধবহির্ভূত এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে বাহিনী পাঠানোর বিষয়টি রয়েছে। এ ছাড়া সামুদ্রিক টহল বিমান, বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী দল এবং সমুদ্রের মাইন শনাক্ত ও অপসারণে ব্যবহৃত মানববিহীন ব্যবস্থা মোতায়েনের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করছে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী।

তবে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত দেশে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হতে পারে। বিরোধী দল এরই মধ্যে সম্ভাব্য সেনা মোতায়াতের বিরোধিতা করেছে। ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির কয়েকজন সদস্যও এর বিরোধিতা করছেন। দেশটির বিভিন্ন শহরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভও হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৫০ সালের কোরীয় যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন দক্ষিণ কোরিয়ার পাশে দাঁড়ানোর পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। বর্তমানে প্রায় ২৯ হাজার মার্কিন সেনা দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে।

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতার কারণে দেশটির নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। বিনিময়ে বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে দক্ষিণ কোরিয়াও সহযোগিতা করেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা ইস্যুতে চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলেও আলোচনার মাধ্যমে পরে তা ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।

এখন ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে হরমুজ প্রণালিতে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্ভাব্য সামরিক ভূমিকা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে তেহরানের সরাসরি হুঁশিয়ারির কারণে সিউলকে অর্থনৈতিক স্বার্থ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত তিন দিকই বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন