- ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে উত্তেজনার দিকে গেলেও আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে যুদ্ধ যেন সর্বাত্মক রূপ না নেয়, সেটিই এখন ওয়াশিংটনের অন্যতম বড় রাজনৈতিক হিসাব হয়ে উঠেছে। রিপাবলিকানদের কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সংকীর্ণ হওয়ায় যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নির্বাচনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা।
সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি ইরানের ওপর সামরিক চাপের বদলে অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আগস্টে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য এবং দেশটির তেল আয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৬০টি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানি বন্দরগুলো ঘিরে মার্কিন নৌ অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। এর মাধ্যমে ইরানের তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে ওয়াশিংটন।
তবে সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক দিনগুলোতেও ইরানে হামলা চালানো হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স চলতি সপ্তাহে বলেছেন, অর্থনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক ও গোপন অভিযান সব ধরনের পথই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খোলা রয়েছে।
৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ যদি এর আগে আবার বড় আকার ধারণ করে, তাহলে এর বিরূপ প্রভাব ভোটারদের ওপর পড়ে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ক্ষতি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
রয়টার্স/ইপসোসের আগস্টের শেষ দিকের এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। বিপরীতে ৬৩ শতাংশ এর বিরোধিতা করেছেন। যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্পের অনুমোদনযোগ্যতার হারও ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশে নেমেছে বলে ওই জরিপে উঠে এসেছে।
যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দামও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি ও পরিশোধন সক্ষমতার সংকট এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
এ পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য বিশেষভাবে অস্বস্তিকর। কারণ, নির্বাচনী প্রচারে তিনি জ্বালানির দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে না জড়ানোর কথাও বলেছিলেন।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে খাদ্যপণ্য, শিল্পপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দামে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রশ্নটিও নির্বাচনের আগে নতুন করে রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
আগস্টে পলিটিকোর এক জরিপে ৬১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে তাদের পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এক মাস আগের তুলনায় এই হার চার শতাংশ বেশি।
ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে সংঘাতকে সীমিত রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি এক হোয়াইট হাউস ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করতেও অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। তার দাবি, সংঘাতের প্রভাব দিন দিন কমে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০টি জাহাজকে তারা নিরাপদে চলাচলে সহায়তা করছে এবং চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল ওই পথ দিয়ে পরিবহন হয়েছে। তবে শিপিং-সংক্রান্ত তথ্য এই দাবির পুরোপুরি সমর্থন করে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’—এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, প্রতিটি পাল্টাপাল্টি হামলাই সংঘাতকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মরতাজাভির মতে, অর্থনৈতিক চাপের মুখে তেহরান সহজে নতি স্বীকার করবে—এমন সম্ভাবনা কম। দুই পক্ষই হয়তো মনে করতে পারে যে তারা উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে, কিন্তু প্রতিটি নতুন সংঘর্ষ আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এদিকে চলতি সপ্তাহে দক্ষিণ ইরানের কুহেস্তাকে একটি হামলায় একটি বেসামরিক বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল বলে জানা গেছে। ঘটনায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশুও ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলমান সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেতৃত্বের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে লিখিত মূল্যায়নে সতর্ক করেছেন যে বর্তমান গতিতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। এতে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি মনে করেন, ইরানে সাম্প্রতিক মার্কিন হামলাগুলো থেকে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থানে অনিশ্চয়তা স্পষ্ট হয়েছে। তার মতে, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে চাপে রাখার নীতি নেওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই আবার সামরিক হামলায় ফিরে গেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানও সংঘাতকে নিজের কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সামরিক সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকলেও ইরান দীর্ঘদিন ধরে অসম যুদ্ধকৌশল বা ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’-এর ওপর নির্ভর করে আসছে।
স্বল্পমূল্যের বিপুলসংখ্যক ড্রোন ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যস্ত রাখা, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি—এসব কৌশল এর অংশ।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরান যদি মার্কিন বা আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটি, জাহাজ কিংবা জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বাড়ায়, তাহলে ওয়াশিংটনের ওপর আরও কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়ার চাপ তৈরি হবে। এর ফলে পাল্টাপাল্টি হামলার একটি চক্র শুরু হয়ে সংঘাত আবার পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বাড়ানো হবে কি না, তা নিয়ে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে আলোচনা করছেন। তবে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ফেরার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
নির্বাচনে রিপাবলিকানরা ভালো ফল করলে ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেতে পারে। অন্যদিকে কংগ্রেসের কোনো একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে যুদ্ধ পরিচালনা, সামরিক ব্যয় ও সরকারের নীতির ওপর তদন্ত এবং শুনানির সুযোগ বাড়বে।
তবে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতির আশঙ্কাও করছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচনে ট্রাম্পের দল পরাজিত হলেও তিনি আরেক দফা নির্বাচনী চাপ থেকে মুক্ত হয়ে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বদলে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারেন।
ফলে আগামী দুই মাস যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটন যেমন নির্বাচন পর্যন্ত যুদ্ধকে সীমিত রাখতে চাইছে, তেমনি তেহরানও নিজেদের স্বার্থে ভিন্ন কৌশল নিতে পারে। আর সেই হিসাবের সামান্য ভুলই সংঘাতকে আবারও বড় আকারের যুদ্ধে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।