- ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ক্লাস শুরুর সময় পেরিয়ে গেলেও স্কুলে ঢুকছিল না কোনো শিক্ষার্থী। তবে এবার পড়াশোনা বাদ দেওয়ার কারণ ছিল না দুষ্টুমি কিংবা ছুটির আনন্দ। বরং নিজেদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের সামনে দাবি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল উত্তর প্রদেশের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২২ শিক্ষার্থী।
ভারতের উত্তর প্রদেশের সামুহি ভাটপুরওয়া গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গত ২২ আগস্ট ক্লাস বর্জন করে প্রতিবাদ শুরু করে। তাদের প্রধান দাবি ছিল, জরাজীর্ণ স্কুল ভবনটি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করতে হবে।
লাল-সাদা চেকের স্কুল পোশাক পরা এসব শিক্ষার্থীর অনেকের বয়স ১০ বছরেরও কম। তাদের কয়েকজনের হাতে ছিল ভারতের জাতীয় পতাকাও। স্কুলের পুরোনো ভবনের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে ধ্বংসস্তূপে পড়ে আছে। ২০২৩ সালে ভবনের একটি দেয়াল ধসে এক ছাত্রী গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকেই নতুন ভবনের দাবি জানিয়ে আসছিল শিশুরা।
কিন্তু দীর্ঘদিন তাদের দাবিতে কর্তৃপক্ষের সাড়া না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ক্লাস বর্জনের পথ বেছে নেয় তারা। শিশুদের এই ব্যতিক্রমী আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষা বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্কুলটিতে যান।
ব্লক শিক্ষা কর্মকর্তা দীপক আওয়াস্তি শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেন, শিগগিরই সেখানে নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে। কর্মকর্তার কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরে যায়।
আট বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী প্রিয়া জানায়, নতুন ভবন নির্মাণের আশ্বাস পেয়ে তারা স্বস্তি পেয়েছে। জরাজীর্ণ ভবনটি নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয় এবং সেই ভয় তাদের পড়াশোনায়ও মনোযোগ দিতে বাধা দেয় বলে জানায় সে।
সামুহি ভাটপুরওয়ার শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ভারতের অন্তত ১০টি রাজ্যের সরকারি স্কুলে সাম্প্রতিক সময়ে একই ধরনের আন্দোলনের খবর পাওয়া গেছে। মহারাষ্ট্র, বিহার, রাজস্থান, ঝাড়খণ্ড ও মধ্যপ্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক সংকট, বিদ্যুৎ, পানি, বেঞ্চ ও স্কুল ভবনের মতো মৌলিক সুবিধার দাবিতে বিক্ষোভ করেছে।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে অনেকে ভারতের নতুন প্রজন্মের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বাড়তে থাকা অসন্তোষের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
ভারতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। দেশটিতে প্রায় ১৫ লাখ স্কুলে প্রায় ২৪ কোটি ৭০ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এর বড় একটি অংশ সরকারি স্কুলে শিক্ষা নেয়।
সরকারি হিসাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের স্কুলে প্রবেশাধিকার এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক সরকারি স্কুল এখনো অবকাঠামোগত সংকটে ভুগছে।
কোথাও স্কুল ভবনের অবস্থা নাজুক, কোথাও পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। আবার কিছু স্কুলে পানীয় জল, বিদ্যুৎ, শৌচাগার কিংবা বসার বেঞ্চের মতো মৌলিক সুবিধাও অনুপস্থিত। এমনকি দেশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এক লাখের বেশি স্কুলে মাত্র একজন করে শিক্ষক রয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে কয়েক মিলিয়ন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
এ ছাড়া শিক্ষক বা শিক্ষার্থী নেই এমন শত শত ‘ঘোস্ট স্কুল’-এর অস্তিত্বও সরকারি তথ্যে উঠে এসেছে।
উত্তর প্রদেশের আরেকটি স্কুলেও গত জুলাইয়ে শিক্ষার্থীরা মৌলিক সুযোগ-সুবিধার দাবিতে বিক্ষোভ করে। সেখানে বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার্থীদের গরমের মধ্যে পড়াশোনা করতে হচ্ছিল। পর্যাপ্ত বেঞ্চ না থাকায় অনেককে মেঝেতে বসতে হতো।
মহারাষ্ট্রের পার্লিতে একটি স্কুলের শিক্ষার্থীরা শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে ক্লাস বর্জন করে। বিহারের একটি স্কুলের শিক্ষার্থীরা আবার মধ্যাহ্নভোজের নিম্নমানের খাবারের অভিযোগ নিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার হেঁটে একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তার কাছে যায়।
শিক্ষা অধিকারকর্মীদের মতে, এসব ঘটনা কেবল শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক ক্ষোভ নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল।
ভারতে সাম্প্রতিক তরুণদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় স্কুলশিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদকে নতুন প্রজন্মের আন্দোলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় ও চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের মধ্যে পরীক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম, বেকারত্ব ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার বিরুদ্ধে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে ওঠে।
‘ককোরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক সংগঠনও এই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। পরে সংগঠনটি স্কুলের অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের দাবিতে ‘স্কুল ঠিক করো’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করে।
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, গ্রামাঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক দীর্ঘদিন ধরে স্কুলের দুরবস্থা নিয়ে অভিযোগ করে আসছেন। এখন শিশুরাই নিজেদের অধিকার নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলছে।
ভারতের শিক্ষা খাতে এসব প্রতিবাদ ভবিষ্যতে রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দেশটির মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ১৮ বছরের নিচে। বর্তমানে যারা স্কুলে পড়ছে, তাদের বড় একটি অংশ ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় ভোটার হবে।
শিক্ষা অধিকারকর্মীদের মতে, শিশুদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে এর প্রভাব শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও পড়বে।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক আন্দোলন তাই একটি স্পষ্ট বার্তাই দিচ্ছে—শুধু স্কুলে যাওয়ার সুযোগ নয়, নিরাপদ ভবন, দক্ষ শিক্ষক, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার এবং মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশও তাদের মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করতে এবার ছোট শিক্ষার্থীরাও কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব চাইতে শুরু করেছে।