Monday, August 31, 2026

ইরান যুদ্ধের ছয় মাসে মার্কিন তেল কোম্পানির মুনাফা বাড়লেও বাড়ছে উপসাগরীয় ঝুঁকি


ছবিঃ পারস্য উপসাগরের জ্বালানি খাতে ইরান-সংশ্লিষ্ট যুদ্ধের আঘাত ও তেলের ভবিষ্যতের ওপর এর প্রভাবের পর্যালোচনা (সংগৃহীত । আল জাজিরা)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের ছয় মাসে বড় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করেছে। বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বিঘ্ন এবং মূল্যবৃদ্ধির কারণে কম পরিমাণ তেল বিক্রি করেও কোম্পানিগুলোর আয় বেড়েছে। তবে একই সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ, উৎপাদন ও ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলোকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২২ শতাংশ বেড়েছে। ব্যারেলপ্রতি দাম ৭২ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৮৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। তেলের দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলো সরাসরি আর্থিক সুবিধা পেলেও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবকাঠামো ও অংশীদারত্বের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য অনেকটাই বন্ধ রয়েছে। গত সপ্তাহে ইরান ও ওমান একটি সাময়িক সামুদ্রিক রুট নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছালেও প্রণালিটির পূর্ণাঙ্গ পুনরায় খোলার বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

রিস্ট্যাড এনার্জির আপস্ট্রিম গবেষণার ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল চৌধুরীর মতে, সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন কোম্পানিগুলোর তেল ও গ্যাস উত্তোলন ইতোমধ্যে কমেছে। চলতি বছরে ওই অঞ্চল থেকে মার্কিন কোম্পানিগুলোর গ্যাস সরবরাহের অংশ গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ এবং তেল সরবরাহ ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে তেলের বাড়তি দাম তাৎক্ষণিকভাবে এই ঘাটতির আর্থিক প্রভাব অনেকটাই সামলে দিয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হলে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হতে পারে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে সক্রিয় মার্কিন কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের মধ্যে রয়েছে মার্কিন জায়ান্ট Chevron। উপসাগরীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় কোম্পানিটির সরাসরি নির্ভরতা তুলনামূলক কম। মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলটি এর বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত। ৩১ জুলাই প্রকাশিত হিসাবে কোম্পানিটি প্রায় ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক মুনাফা হিসেবে সমন্বিত আয় ১২ বিলিয়ন ডলার জানিয়েছে।

অন্যদিকে ExxonMobil মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির প্রভাব বেশি অনুভব করছে। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে কোম্পানিটির কার্যক্রম রয়েছে। দুটি দেশ মিলিয়ে বৈশ্বিক ইক্যুইটি আপস্ট্রিম সরবরাহে কোম্পানিটির অংশ প্রায় ২০ শতাংশ। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং ইরান-সংশ্লিষ্ট হামলায় ওই অঞ্চলের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন কমেছে।

রাহুল চৌধুরীর হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে এক্সনমোবিলের আপস্ট্রিম আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার কমেছে। তবে বাড়তি পণ্যমূল্যের কারণে এই ঘাটতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

উপসাগরীয় জ্বালানি খাত মূলত সৌদি আরামকো, আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (ADNOC) ও কাতারএনার্জির মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। তারপরও মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলো উৎপাদন, যৌথ উদ্যোগ, পরিশোধনাগার, পেট্রোকেমিক্যাল প্রকল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তি ও প্রকৌশল চুক্তির মাধ্যমে এই অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।

এক্সনমোবিল দীর্ঘদিন ধরে কাতারের এলএনজি খাতে বড় অংশীদার। কাতারএনার্জির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে নর্থ ফিল্ড সম্প্রসারণ প্রকল্পে কোম্পানিটির বিনিয়োগ রয়েছে। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আপার জাকুম তেলক্ষেত্রেও তাদের অংশীদারত্ব রয়েছে।

ConocoPhillips ২০২২ সালে কাতারএনার্জির সঙ্গে নর্থ ফিল্ড ইস্ট ও নর্থ ফিল্ড সাউথ সম্প্রসারণ প্রকল্পে যুক্ত হয়। এসব প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল রাস লাফান থেকে কাতারের এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা আরও বাড়ানো।

অন্যদিকে Occidental Petroleum ওমানে অন্যতম বড় বিদেশি তেল উৎপাদক। দেশটির সবচেয়ে বড় উৎপাদনশীল তেলক্ষেত্র মুকাইজনায় কোম্পানিটির কার্যক্রম রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের গ্যাস ও পাইপলাইন প্রকল্পেও প্রতিষ্ঠানটির অংশীদারত্ব রয়েছে।

আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (ACLED)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর ছয়টি উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশে ইরান ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো অ-সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে অন্তত ১৭২টি হামলা চালিয়েছে।

এসব হামলার প্রায় ৪৮ শতাংশের লক্ষ্য ছিল তেল-গ্যাস স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র। কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে সবচেয়ে বেশি সফল হামলার ঘটনা ঘটেছে।

কুয়েতের মিনা আবদুল্লাহ ও মিনা আল-আহমাদি রিফাইনারি, বাহরাইন পেট্রোলিয়াম কোম্পানির রিফাইনারি এবং ADNOC-এর আল-রুয়াইস শিল্পাঞ্চল ও হাবশান গ্যাস কমপ্লেক্স হামলার শিকার হয়েছে।

সৌদি আরামকোর গুরুত্বপূর্ণ আবকাইক তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কমপ্লেক্সেও ২৭ জুলাই ড্রোন হামলা হয়। প্রতিদিন সাত মিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা থাকা এই স্থাপনাটি সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

ACLED-এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সহকারী গবেষণা ব্যবস্থাপক নাসের খদুরের মতে, তেল-গ্যাস স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পানি পরিশোধন অবকাঠামো ভবিষ্যতেও হামলার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে থাকতে পারে। এসব খাতে বিঘ্ন ঘটলে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামও বেড়ে যেতে পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি কাতার। বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানি কেন্দ্র রাস লাফান শিল্পাঞ্চলে একাধিক হামলা হয়েছে। এখানে কাতারএনার্জির সঙ্গে এক্সনমোবিল ও কনোকোফিলিপসের গুরুত্বপূর্ণ যৌথ উদ্যোগ রয়েছে।

মার্চে হামলার পর রাস লাফানের একটি অংশে উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে জুনে কাতারের বারজান গ্যাস প্রকল্পে একটি বিস্ফোরণে অন্তত ১৩ জন নিহত হন। ঘটনাটিকে কর্তৃপক্ষ ‘কারিগরি ত্রুটি’র ফল বলে জানিয়েছিল।

রিস্ট্যাড এনার্জির হিসাবে, কাতার থেকে এক্সনমোবিলের এলএনজি সরবরাহ চলতি বছরে কমে প্রায় ৪০ লাখ টনে দাঁড়াতে পারে, যেখানে গত বছর তা ছিল প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন। কনোকোফিলিপসের সরবরাহও ২৫ লাখ টন থেকে কমে প্রায় ১০ লাখ টনে নেমে আসতে পারে।

রাস লাফানের ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি ট্রেনগুলোর সক্ষমতা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে মেরামত ব্যয় প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে এবং কাতারের নর্থ ফিল্ড সম্প্রসারণ প্রকল্পের সময়সূচিও পিছিয়ে যেতে পারে।

সংঘাতের প্রভাব পড়েছে ইরাকের তেলক্ষেত্রেও। মার্চে সারসাং তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলা এবং এপ্রিলে একটি সংরক্ষণাগারে বিস্ফোরণের ঘটনায় ওই তেলক্ষেত্রের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এক্সনমোবিলের সংযুক্ত আরব আমিরাতের আপার জাকুম প্রকল্পও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত রপ্তানি রুটে বিঘ্নের কারণে সমুদ্রভিত্তিক ওই তেলক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল পরিবহনে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল।

শুধু উৎপাদক নয়, মার্কিন তেলক্ষেত্র পরিষেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। SLB, Halliburton ও Baker Hughes উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদি আরামকো, ADNOC ও কাতারএনার্জিকে প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও প্রকৌশল সহায়তা দিয়ে থাকে।

রিস্ট্যাড এনার্জির বিশ্লেষক চিন্ময়ী তেগ্গির মতে, যুদ্ধের কারণে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এই তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ কমেছে। বাড়তি তেলের দাম অন্য অঞ্চলের আয় বাড়িয়ে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে দিলেও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং প্রকল্প বিলম্ব তাদের ওপর চাপ তৈরি করছে।

সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জন্য এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি করেছে। তেলের উচ্চমূল্য স্বল্পমেয়াদে তাদের মুনাফা বাড়াচ্ছে, কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলে বিপুল বিনিয়োগ ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা ঝুঁকি দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার প্রবৃদ্ধিকে অনিশ্চিত করে তুলছে।

হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে এই ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। ফলে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর সামনে এখন শুধু বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ধরে রাখার প্রশ্ন নয়, একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ও ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলো কীভাবে নিরাপদ রাখা যায়—সেটিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন