Monday, August 24, 2026

ইরানের ওপর নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপের হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের, পাল্টা জবাবের সতর্কতা তেহরানের ও


ছবিঃ ইরান (সংগৃহীত । আল জাজিরা)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN 

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থমকে যাওয়ার মধ্যে তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোকেও কঠোর অর্থনৈতিক শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে সহযোগিতা করা কোনো দেশকে তারা শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন, ইরানের ওপর নতুন করে আরোপিত অর্থনৈতিক পদক্ষেপ দেশটির সরকারকে ভেঙে দিতে পারে। তিনি বিশ্বের অন্যান্য দেশকেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে এই চাপ প্রয়োগের প্রচেষ্টায় যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ নামে তেহরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করতে দেশটির বন্দরগুলো ঘিরে নৌ অবরোধ চালানোর পাশাপাশি তেল বিক্রির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন কোম্পানি, মধ্যস্থতাকারী ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত বুধবার ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান চালানোর ঘোষণা দেন। ইরান চুক্তির সুযোগ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে দাবি করে তিনি দেশটির বিরুদ্ধে নজিরবিহীন মাত্রায় অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতার হুঁশিয়ারি দেন।

ট্রাম্প একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোকেও সতর্ক করে বলেন, যেসব দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থা ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা দেবে, তাদেরও বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে।

এর একদিন পর মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল হবে ‘এক-দুই ঘায়ের’ মতো। একদিকে অবরোধ, অন্যদিকে ইতিহাসের কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা এই দুইয়ের মাধ্যমে তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।

বেসেন্ট আরও সতর্ক করেন, কোনো দেশ যদি ইরানের সঙ্গে অর্থ লেনদেন, তেল কেনাবেচা কিংবা সমুদ্রপথে পরিবহনের মতো কার্যক্রম চালিয়ে যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও মার্কিন অর্থ বিভাগ ও সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।

তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনাকে দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের ব্যাংক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা বিমানবন্দরকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করতে বাধ্য করতে পারে না।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পদক্ষেপও ব্যর্থ হবে। তার ভাষ্য, ইরান এর আগেও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েছে।

তবে ওয়াশিংটনের চাপ মেনে কোনো দেশ ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তাদের বিরুদ্ধেও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই বলেছেন, কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নিলে ইরান তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে। প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে তাদের অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করা হবে; তাতে কাজ না হলে সংশ্লিষ্ট দেশের স্বার্থে আঘাত করা হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

রেজাই আরও হুঁশিয়ারি দেন, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অভিযানে যুক্ত হলে হরমুজ প্রণালিসহ বিকল্প পথেও তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। শান্তিকালে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস রপ্তানি এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে চলাচল করে।

ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন পরিকল্পনায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে চীন ও রাশিয়া। চীন এরই মধ্যে বলেছে, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ প্রয়োগ সমস্যার সমাধান করতে পারে না। বেইজিং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের ওপর ওয়াশিংটনের প্রভাব সীমিত। বিশেষ করে চীনের জ্বালানি খাতের বড় একটি অংশ মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তুলনামূলকভাবে কম নির্ভরশীল।

ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রেও চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশ্লেষণভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরান থেকে সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ চীন কিনেছে। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও বিভিন্ন পদ্ধতিতে ইরানি তেল বাণিজ্য অব্যাহত থাকার তথ্যও সামনে এসেছে।

অন্যদিকে রাশিয়া ইরানের তুলনামূলকভাবে ছোট বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বিকল্প বাণিজ্যিক ও আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও মস্কো ও তেহরানের মধ্যে সহযোগিতা রয়েছে।

ফলে কূটনৈতিক আলোচনা যখন অচলাবস্থায়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক চাপ ইরানকে কতটা বিচ্ছিন্ন করতে পারবে এবং তেহরান কতটা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে তা এখন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন