- ২২ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
লিবিয়ার সাবেক নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের ১৫ বছর পরও দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা কাটেনি। ২০১১ সালের বিপ্লবের সময় দেশ ছাড়তে শুরু করা বহু তরুণ পেশাজীবী এখনো যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন। তবে দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তাদের একটি বড় অংশ আবারও লিবিয়ায় ফিরতে চান।
তাদেরই একজন সারাহ মিজরান। ৩২ বছর বয়সী এই স্থপতি ২০১১ সালের আগস্টে ত্রিপোলি পতনের সময় কিশোরী ছিলেন। বিরোধী যোদ্ধারা রাজধানী দখলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে গাদ্দাফির ৪২ বছরের শাসনের অবসান শুরু হয়। পরে সির্তের কাছে আটক হওয়ার পর গাদ্দাফি নিহত হন।
মিজরান প্রায় আট বছর আগে লিবিয়া ছেড়ে যুক্তরাজ্যে যান। সেখানে স্থাপত্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেন এবং বিশেষ করে টেকসই স্থাপত্য নিয়ে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে ত্রিপোলির বিভিন্ন স্থাপনা ও নগর উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা করছেন তিনি।
মিজরানের মতে, তরুণ পেশাজীবীরা দেশ ছাড়লে শুধু দক্ষ জনশক্তিই হারায় না, তাদের সঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদও কমে যায়। তাঁর ভাষায়, একটি প্রজন্ম যদি মনে করে ভবিষ্যৎ গড়তে হলে দেশ ছেড়ে যেতেই হবে, তাহলে ধীরে ধীরে দেশের প্রতি তাদের আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
স্থপতি হিসেবে লিবিয়ার স্থাপত্য ও নগর পরিবেশ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। তবে দেশে ফেরার বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর। মিজরানের বিশ্বাস, দেশে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরলে প্রবাসী লিবীয়দের একটি বড় অংশ আবার দেশে ফেরার আগ্রহ দেখাবে।
শুধু মিজরান নন, একই অভিজ্ঞতা রয়েছে ৩৬ বছর বয়সী নাদের এলগাদিরও। ২০১৪ সালে লিবিয়ার দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের সময় ত্রিপোলির বিমানবন্দর ঘিরে সংঘাত শুরু হলে তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। এর আগে ত্রিপোলিতে নিজের একটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন তিনি।
যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর সেখানেই নতুন করে জীবন শুরু করতে হয় এলগাদিকে। পরে ২০১৮ সালে তিনি ‘লিবিয়া ইন দ্য ইউকে’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটির লক্ষ্য, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত লিবীয় প্রবাসীদের মধ্যে নিজেদের দেশ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যোগাযোগ তৈরি করা এবং একটি উন্নত লিবিয়া গঠনের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা।
এলগাদি এখন যুক্তরাজ্যকেই নিজের বাড়ি হিসেবে দেখেন। একই সঙ্গে লিবিয়ার সঙ্গে তাঁর পেশাগত যোগাযোগও রয়েছে। তাঁর মতে, দেশে ফিরে স্থায়ীভাবে বসবাস করার পরিকল্পনার চেয়ে লিবিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখে ভবিষ্যতে কীভাবে অবদান রাখা যায়, সেটিই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে লিবিয়ার উন্নয়নে প্রবাসী দক্ষ জনশক্তির ভূমিকা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের ভিজিটিং ফেলো তারেক মেগেরিসির মতে, লিবিয়ায় এখনো বিপুলসংখ্যক দক্ষ ও প্রযুক্তিগতভাবে অভিজ্ঞ মানুষ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধার কারণে তারা নিজেদের দক্ষতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছেন না।
মেগেরিসির মতে, ২০১১ সালের বিপ্লবের পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু লিবীয় দেশে ফিরে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে তরুণ দক্ষ পেশাজীবীর পাশাপাশি অভিজ্ঞ প্রবীণরাও ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজন, দুর্নীতি ও দুর্বল প্রশাসনের কারণে প্রত্যাশিত পরিবর্তন বাস্তবে আসেনি।
এর ফলে উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণদের একটি অংশ আবার দেশ ছাড়ার পথ বেছে নিয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, দেশে যদি বিশ্বাসযোগ্য ও স্থিতিশীল সুযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে প্রবাসী লিবীয়দের অনেকেই দ্রুত দেশে ফিরে আসতে আগ্রহী হবেন।
অবশ্য লিবিয়ার ‘ব্রেইন ড্রেইন’ বা মেধাপাচার দেশটির শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলেছে, সে বিষয়ে সবাই একমত নন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ঝুঁকি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিআরআই মেনাসের সহযোগী টবি চিতায়াতের মতে, লিবিয়ার পূর্ব-পশ্চিম বিভাজন, তেলনির্ভর অর্থনীতি ও দুর্নীতির মতো বড় সমস্যার তুলনায় মেধাবীদের দেশত্যাগের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম।
তবু একটি বিষয় স্পষ্ট ২০১১ সালের বিপ্লবের পর প্রজন্মের পর প্রজন্ম লিবীয় তরুণদের সামনে দেশেই ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ তৈরি করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই সুযোগ তৈরি না হলে বিদেশে গড়ে ওঠা দক্ষ প্রবাসী প্রজন্মের সঙ্গে দেশের দূরত্ব আরও বাড়তে পারে।
মিজরানের ভাষায়, ‘বাড়ি’ এমন কোনো জায়গা নয়, যা মানুষ একবার খুঁজে পেলেই চিরদিনের জন্য ধরে রাখে। বরং সময়ের সঙ্গে মানুষ সেটি বারবার নতুন করে তৈরি করে। তাঁর মতো অনেক প্রবাসী লিবীয়ের কাছে সেই ভবিষ্যৎ হয়তো আবারও নিজের দেশেই তৈরি হতে পারে যদি সেখানে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও কাজ করার মতো বাস্তব সুযোগ ফিরে আসে।