- ২১ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রণালির নৌ চলাচল এখনো মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এমনকি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র এই কৌশলগত জলপথের ওপর সরাসরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে ইরানের অবস্থান, তেহরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজকে প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে দেওয়া হবে না। এর পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজ ও আশপাশের এলাকায় নৌ অবরোধ চালু করেছে। ফলে বাস্তবে হরমুজ প্রণালিতে কার নিয়ন্ত্রণ কতটা—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিল পরিস্থিতি।
মঙ্গলবার ট্রাম্প দাবি করেন, জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে। তবে সামুদ্রিক চলাচলের তথ্য বলছে, যুদ্ধের কারণে জাহাজগুলো আগের স্বাভাবিক নৌপথ থেকে সরে গিয়ে অনেক বেশি সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালিকে মূলত একটি অভিন্ন নৌপথ হিসেবেই ব্যবহার করা হতো। জাহাজগুলো নিরাপত্তা ও বন্দরভিত্তিক প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম অনুসরণ করে প্রণালির মাঝামাঝি অংশ দিয়ে চলাচল করত।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর নৌ চলাচল কার্যত দুটি প্রধান রুটে বিভক্ত হয়েছে। একটি ইরানের উপকূলঘেঁষা উত্তরাঞ্চলীয় পথ, যা লারাক ও কেশম দ্বীপের কাছ দিয়ে ইরানি বন্দর ও অফশোর টার্মিনালের দিকে যায়।
অন্যটি দক্ষিণের ওমানি রুট। এটি ওমানের উপকূলের কাছাকাছি এবং ইরানের ভূখণ্ড থেকে তুলনামূলক দূরে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর নিরাপত্তায় চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে এই পথ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১৯ আগস্টের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মোট ২৩৬টি জাহাজ চলাচল করেছে। এর মধ্যে অপরিশোধিত তেল, এলপিজি ও এলএনজি বহনকারী জাহাজ ছিল ১১২টি।
এই ১১২টি জ্বালানি বহনকারী জাহাজের মধ্যে ২১টি প্রকাশ্যে ইরানি রুট ব্যবহার করেছে। মাত্র দুটি জাহাজ ওমানি রুট ব্যবহারের তথ্য দিয়েছে। বাকি ৮৯টি জাহাজের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রুট শনাক্ত করা যায়নি।
অন্য সব ধরনের জাহাজ—যেমন শুকনো পণ্য ও রাসায়নিক বহনকারী জাহাজ—ধরলে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়। ২৩৬টি জাহাজের মধ্যে ৮৩টি ইরানি রুট, মাত্র তিনটি ওমানি রুট এবং দুটি যুদ্ধের আগের কেন্দ্রীয় পথ ব্যবহার করেছে। বাকি ১৪৮টি জাহাজের চলাচলের পথ ছিল অজ্ঞাত বা ‘ডার্ক’।
এর অর্থ, হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী ছয়টির বেশি জাহাজের মধ্যে একটি তাদের প্রকৃত গতিপথ প্রকাশ করেনি।
জাহাজগুলোর বড় একটি অংশ অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম বা AIS বন্ধ করে দিচ্ছে। এর ফলে সামরিক বাহিনী জাহাজের অবস্থান ও গতিপথ সহজে শনাক্ত করতে পারে না।
চলমান সংঘাতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই নৌ চলাচলের নিয়ম অমান্য করার অভিযোগে জাহাজে হামলা চালিয়েছে। ফলে জাহাজ পরিচালনাকারীরা নিরাপত্তার কারণে নিজেদের অবস্থান গোপন রাখার চেষ্টা করছেন বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষক নিল কুইলিয়ামের মতে, ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখলে জাহাজের সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়। তবে এর ফলে নৌ নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার ঝুঁকিও বাড়ে।
এ ছাড়া মাঝসমুদ্রে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও এমন ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে জাহাজের প্রকৃত গন্তব্য বা পণ্যের উৎস গোপন রাখা সম্ভব হয়।
হরমুজের বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন পক্ষ বাস্তবে বেশি প্রভাব বিস্তার করছে, তা নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। কারণ অধিকাংশ জাহাজই তাদের গতিপথ গোপন রাখছে।
তবে কেপলারের তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জ্বালানি বহনকারী জাহাজ প্রকাশ্যেই ইরানি রুট ব্যবহার করেছে।
অন্যদিকে ইরানের নির্ধারিত রুট ছাড়া প্রকাশ্য অন্য কোনো রুট ব্যবহার করেছে খুব অল্পসংখ্যক জাহাজ। ফলে জাহাজ পরিচালনাকারীদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইরানের নির্দেশ অমান্য করার বিষয়ে বেশি সতর্কতা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর অর্থ এই নয় যে ইরান পুরোপুরি হরমুজ নিয়ন্ত্রণ করছে। বরং প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার মতো সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা এখনো তেহরানের হাতে রয়েছে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, গোটা বিশ্ব অর্থনীতির জন্যই অত্যন্ত বড়। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করলেও আগস্টের প্রথম ১৯ দিনে মোট ২৩৬টি জাহাজের চলাচল পরিস্থিতির বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৬ ডলার ছিল। পরবর্তী সময়ে তা কয়েক দফায় ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায় এবং জুলাইয়ে ১১৯ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। বৃহস্পতিবার ব্রেন্টের দাম ছিল প্রায় ৯২ দশমিক ৯ ডলার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের প্রভাব কমছে—এমন ধারণা তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তেহরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চাপ প্রয়োগের মাধ্যম দুর্বল হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান এখনো এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করার সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
ফলে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্পের দাবি, ইরানের পাল্টা অবস্থান এবং জাহাজগুলোর গোপন গতিপথ—সব মিলিয়ে এই কৌশলগত জলপথ এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উত্তেজনাকেন্দ্র হয়ে উঠেছে।