Tuesday, August 18, 2026

যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্কের মুখে কানাডা, শেষ মুহূর্তে সমঝোতার চেষ্টা


ছবিঃ ১৬ জুন, ২০২৬ তারিখে ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেঁ-তে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে কথা বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (সংগৃহীত । আল জাজিরা /এপি-র মাধ্যমে ইভলিন হকস্টাইন/পুল ছবি)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন নতুন করে বড় ধরনের শুল্কের চাপের মুখে পড়েছে কানাডা। শেষ মুহূর্তে কোনো সমঝোতা না হলে বুধবার থেকে কানাডার বিভিন্ন পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করতে পারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এতে দেশটির কয়েকশ কোটি ডলারের রপ্তানি বাণিজ্য সরাসরি ঝুঁকিতে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শুল্কের আওতায় রয়েছে ইলেকট্রনিক পণ্য, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, দুগ্ধজাত পণ্য, ওয়াইনসহ কানাডার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ২০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের কানাডীয় পণ্য এই শুল্কের আওতায় পড়তে পারে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা থেকে আমদানির প্রায় ৫ শতাংশ।

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি, দুগ্ধজাত পণ্য ও অ্যালকোহলজাত পানীয়ের ক্ষেত্রে কানাডা বৈষম্যমূলক বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করছে। এর প্রতিক্রিয়াতেই নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে এবারের শুল্কের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ১৯৩০ সালের ট্যারিফ আইনের ৩৩৮ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে প্রথমবারের মতো এমন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তি বা ইউএসএমসিএর আওতায় যেসব পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার কথা, সেগুলোর একটি অংশও নতুন শুল্কের আওতায় পড়তে পারে।

প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় করা এই ত্রিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির বিভিন্ন ছাড়ের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মোট বাণিজ্যের আনুমানিক ৮৫ শতাংশ এখনো শুল্কমুক্ত রয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সেই বাণিজ্য কাঠামো বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে।

মন্ট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ জুলিয়ান কারাগুয়েসিয়ান মনে করেন, ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে কানাডার ছোট-বড় ব্যবসা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফুলের কন্দ উৎপাদনকারী ও মৌমাছি পালনকারী থেকে শুরু করে হকি সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক, সিমেন্ট, দুগ্ধ ও ওয়াইন শিল্প বিভিন্ন খাত এর প্রভাব অনুভব করবে। তার মতে, এত উচ্চ শুল্ক কানাডার বহু পণ্যকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতার বাইরে ঠেলে দিতে পারে।

এদিকে ওয়াশিংটন ও অটোয়ার মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা চলছে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সোমবার আলোচনাকে ‘সংবেদনশীল’ ও ‘তীব্র’ বলে উল্লেখ করেছেন। এর আগে চলতি মাসেই তিনি স্বীকার করেছিলেন, আলোচনার পরিবেশ যথেষ্ট কঠিন হয়ে উঠেছে।

তবে সমঝোতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কানাডার প্রাদেশিক সরকারগুলোর অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালকোহলজাত পণ্যের ওপর কানাডার বিভিন্ন প্রদেশের নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্প প্রশাসনের অসন্তোষের অন্যতম কারণ।

আলবার্টা ও সাসকাচোয়ান ছাড়া কানাডার বাকি প্রদেশগুলো গত বছরের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালকোহলজাত পণ্য বিক্রি বন্ধ রেখেছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতির পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবেই এসব নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডসহ কয়েকজন প্রাদেশিক নেতা শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে মার্কিন অ্যালকোহল বিক্রির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও সবাই একই অবস্থানে নেই।

কুইবেকের প্রিমিয়ার ক্রিস্টিন ফ্রেশেট অবশ্য প্রদেশটির দুগ্ধ, ডিম ও পোলট্রি খাতের ‘সাপ্লাই ম্যানেজমেন্ট’ ব্যবস্থা নিয়ে কোনো ছাড় দিতে নারাজ। তিনি এটিকে কুইবেকের জন্য ‘আলোচনার অযোগ্য’ বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বাণিজ্যযুদ্ধে কানাডার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। দেশটির মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারনির্ভর। কানাডার তুলনায় প্রায় ১৩ গুণ বড় মার্কিন অর্থনীতির ওপর এই নির্ভরতা দেশটির জন্য বড় দুর্বলতা। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ কানাডার বাজারে যায়।

তবে অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের কাছে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার বিষয়ে কানাডার জনগণের মধ্যেও অনীহা রয়েছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, অনেক কানাডীয় নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের প্রতি আগের তুলনায় নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন।

ন্যানোস রিসার্চের গত মাসের এক জরিপে ৬৯ শতাংশ কানাডীয় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালকোহলজাত পণ্য আবার বাজারে ফিরলেও তারা সেগুলো কেনার সম্ভাবনা কম। এমনকি অ্যাঙ্গাস রিড ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক জরিপে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করা কানাডীয়দের হার ইতিবাচক মনোভাবের চেয়ে বেশি দেখা গেছে।

প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অবশ্য সম্ভাব্য শুল্কের বিরুদ্ধে কী ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করেননি। তবে তিনি বলেছেন, কানাডা আলোচনায় ‘শক্ত অবস্থান’ থেকে অংশ নিচ্ছে এবং যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তার সরকারের প্রস্তুতি রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে অটোয়া। এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য সম্ভাবনাময় বাজারে রপ্তানি বাড়াতে কানাডা ইতোমধ্যে বাণিজ্য বহুমুখীকরণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে নতুন বাজার খুঁজে নেওয়া কানাডাকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরির জন্য কানাডার হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী বিকল্পগুলোর একটি হতে পারে জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করা। যদিও এতে কানাডার অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকায় অটোয়া এমন কঠোর পদক্ষেপ নিতে কতটা প্রস্তুত, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।


Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন