- ০৪ অক্টোবর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
নতুন নেতৃত্ব বেছে নিতে সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার নাগরিকরা। রোববার (৪ অক্টোবর) দেশটির জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। প্রায় ৩৪ লাখ ভোটারের এই নির্বাচনের ফল দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের প্রচেষ্টার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এই নির্বাচনে দেশটির ত্রিপক্ষীয় প্রেসিডেন্সির তিন সদস্য, জাতীয় সংসদের আইনপ্রণেতা এবং দুটি স্বায়ত্তশাসিত সত্তা ফেডারেশন অব বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা (এফবিআইএইচ) ও রিপাবলিকা সার্পস্কা এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার কথা।
বসনিয়ার বর্তমান শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের ভয়াবহ যুদ্ধের পর জাতিগত বিভাজন সামাল দিতে ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় করা শান্তিচুক্তির মাধ্যমে এই কাঠামো গড়ে ওঠে। দেশটির প্রধান তিন জাতিগোষ্ঠী বসনিয়াক মুসলিম, অর্থোডক্স সার্ব ও ক্যাথলিক ক্রোয়াটদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারে পুরোনো জাতিগত বিভাজন এবং যুদ্ধের স্মৃতি আবারও গুরুত্ব পেয়েছে। এতে হতাশা প্রকাশ করেছেন দেশটির একাংশের ভোটার।
উত্তর বসনিয়ার তুজলা শহরে ভোটের আগে এএফপিকে দেওয়া এক বক্তব্যে ৩৪ বছর বয়সী কর্মী আদি সেলমান বলেন, নতুন নির্বাচনেও বড় কোনো পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন না। তাঁর মতে, তিন দশক ধরে সক্রিয় থাকা একই রাজনৈতিক দলগুলো যুদ্ধ, উত্তেজনা, বিভাজন ও অতীতের বিষয় সামনে এনে ভোট পাওয়ার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, রিপাবলিকা সার্পস্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সার্ব জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা মিলোরাদ দোদিক নির্বাচনের আগে তাঁর দল অ্যালায়েন্স অব ইন্ডিপেনডেন্ট সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটসের (এসএনএসডি) শেষ নির্বাচনী সমাবেশে বসনিয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি দেশটিকে ‘অসম্ভব’ রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দেন।
রিপাবলিকা সার্পস্কায় তাঁর দল বিচ্ছিন্নতাবাদী অবস্থানের জন্য পরিচিত। ফলে নির্বাচনের ফল দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সার্ব-অধ্যুষিত অঞ্চলের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বসনিয়ার এবারের নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের বিষয়টিও বড় হয়ে উঠেছে। ফেডারেশন অব বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনায় বসনিয়াক দলগুলো তুলনামূলক শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বর্তমান বসনিয়াক প্রেসিডেন্সি সদস্য ডেনিস বেচিরোভিচ দেশটির ইইউ ও ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ইইউ প্রার্থী দেশের মর্যাদা দেওয়া হয়। তবে ২০২৪ সালে সদস্যপদ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর যে পরিকল্পনা ছিল, তা এগোয়নি। দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বিচারব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কারসহ বিভিন্ন শর্ত পূরণের ওপর জোর দিয়েছে ব্রাসেলস।
এদিকে দেশটির ক্রোয়াট জাতীয়তাবাদী দলগুলো নির্বাচনী ব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবি তুলেছে। বিশেষ করে ক্রোয়াট জনগোষ্ঠীর জন্য প্রেসিডেন্সির সদস্য নির্বাচনে আরও বেশি প্রভাব নিশ্চিত করার দাবি তাদের।
অন্যদিকে, বসনিয়ার ইইউ যাত্রা ধীর করার জন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে মস্কোর সঙ্গে রিপাবলিকা সার্পস্কার এসএনএসডির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
এবারের নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভোটগ্রহণে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার। দেশজুড়ে প্রথমবারের মতো ভোটার পরিচয় যাচাইয়ে বায়োমেট্রিক আঙুলের ছাপ শনাক্তকরণ এবং ব্যালট স্ক্যানিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
নির্বাচনী জালিয়াতি কমানো এবং ভোটের স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই প্রযুক্তি চালু করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রোববার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কথা। এরপর শুরু হবে ভোট গণনা এবং রাতেই প্রাথমিক ফল প্রকাশের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
তবে ফলাফল প্রকাশের পর শুধু কে সরকার গঠন করবে, সেটিই নয় দেশটির জাতিগত বিভাজন কতটা কমবে, কেন্দ্র ও আঞ্চলিক সরকারের সম্পর্ক কোন দিকে যাবে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে সদস্যপদের দীর্ঘ পথ কতটা এগোবে, সেদিকেও নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।