Sunday, October 4, 2026

অনিশ্চিত জীবন আর হামলার ভয়, সংকটে ইয়েমেনের শহর মোচার মানুষ


ছবিঃ ২০১৭ সালের শুরুর দিকে হুথি যোদ্ধাদের কাছ থেকে পুনরুদ্ধারের পর ২০১৮ সালে ইয়েমেনের মোখা শহরের ভবনগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে আছে (সংগৃহীত । আল জাজিরা /অ্যান্ড্রু রেনেইসেন/গেটি ইমেজেস)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের শহর মোচায় হুথি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরও হাজারো বেসামরিক মানুষ শহর ও আশপাশের এলাকায় আটকে পড়েছেন। সংঘাতের আতঙ্কের পাশাপাশি অর্থের সংকট তাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পথও কঠিন করে তুলেছে। ফলে হামলার ঝুঁকির মধ্যেই অনেক পরিবারকে ঘর আঁকড়ে থাকতে হচ্ছে।

মোচার উত্তরে ইয়াখতুল গ্রামের দিনমজুর নাবিল ১০ সেপ্টেম্বর ভোরে নিজের বাড়ি থেকে দেখেছিলেন, আতঙ্কে বহু মানুষ শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। কয়েক ঘণ্টা পর হুথি বাহিনী মোচায় প্রবেশ করে। তবে নাবিল ও তাঁর স্বজনেরা থেকে যান।

নাবিলের ভাষায়, বাস্তুচ্যুত হয়ে অন্য কোথাও গিয়ে আশ্রয় নেওয়া মানে অনিশ্চিত ও মর্যাদাহীন জীবন। তিনি কোনো পক্ষের সঙ্গে যুক্ত নন এবং কোনো অপরাধও করেননি—তাই নিজ বাড়িতে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তিনি।

ইয়েমেনে হুথিদের প্রভাব অবশ্য নতুন নয়। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে গোষ্ঠীটি রাজধানী সানা ও দেশটির উত্তরাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ও হুথিদের মধ্যে এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটও জড়িয়েছে।

২০০৪ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী মোচায় প্রায় ৬২ হাজার ৫০০ মানুষের বসবাস ছিল। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর শহরে বর্তমানে কত মানুষ রয়েছেন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না।

সরকারপন্থী বাহিনী মোচা ও আশপাশের এলাকাকে সামরিক অঞ্চল ঘোষণা করেছে। সরকারি পক্ষের অভিযোগ, হুথিরা স্থানীয় বাসিন্দাদের নিজেদের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিতে বা সমর্থনে নামতে চাপ দিচ্ছে।

তবে আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন বাসিন্দা জোর করে সমাবেশে নেওয়ার ঘটনা দেখেননি বলে জানিয়েছেন। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা অবশ্য দাবি করেছেন, তাঁর তিন প্রতিবেশীকে হুথিরা অস্ত্র দিয়েছে এবং তারা এখন সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে।

ওই বাসিন্দার আরও দাবি, একটি সশস্ত্র পিকআপ নিয়মিত একটি পরিবারের বাড়িতে গিয়ে তাদের ছেলেদের হুথিদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দিত। পরিবারটি রাজি না হওয়ায় পরে গাড়িটি চলে যায়।

২০১৭ সালে সরকারপন্থী বাহিনী মোচার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর শহরটি হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে পালিয়ে আসা বহু মানুষের আশ্রয়স্থল হয়েছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শুরুতে উপকূলীয় এলাকায় নতুন করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। অনেক পরিবার আবারও ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়ে আদেন, তাইজ ও লাহিজের দিকে রওনা হয়।

১০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সরকার মোচা ও আশপাশের এলাকাকে ‘কিল বক্স’ বা হামলার ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধাঞ্চল ঘোষণা করে। পরদিন থেকেই সেখানে হামলা শুরু হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, শহর থেকে বের হওয়ার পথ এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয়। সরকার পুরোনো আল-বারহ সড়ক খুলে দেওয়ার কথা জানালেও সবাই সেই পথ দিয়ে বের হতে পারেননি। কেউ পালাতে পেরেছেন, কেউ বাধার মুখে পড়েছেন। আবার অর্থের অভাব ও বাস্তুচ্যুত জীবনের অনিশ্চয়তার কারণে অনেকে বাড়িতেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সংঘাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মোচায় বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। রাতে কারফিউ জারি রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।

নাবিল জানান, রান্নার গ্যাসের একটি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে প্রায় ২০ হাজার ইয়েমেনি রিয়ালে পৌঁছেছে, যা আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। ৫০ কেজি আটার একটি বস্তির দামও প্রায় ৮ হাজার রিয়াল বেড়েছে।

দিনমজুর নাবিলের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। তাঁর কথায়, এক দিনের আয় দিয়ে এখন জ্বালানি ও দুপুরের খাবারের খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে অনেক শিশু স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মানসুর জানান, গোলাবর্ষণের আশঙ্কা এবং তরুণদের যুদ্ধে পাঠানোর ভয় শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে দূরে রেখেছে। সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে থাকা এই শিক্ষকও অর্থের অভাবে মোচা ছাড়তে পারছেন না।

৬০ বছরের বেশি বয়সী উম্ম খালেদের অবস্থাও একই রকম। তাঁর স্বামী শারীরিকভাবে অক্ষম ও শয্যাশায়ী। ফলে পরিবার নিয়ে কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবেন, সেটিই তাঁর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।

পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী তাঁর ছেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং সরকারপন্থী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সে যোগ দিয়েছিলেন। হুথি বাহিনী অগ্রসর হওয়ার পর তিনি পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে গেলেও স্ত্রী ও দুই সন্তানকে মায়ের কাছে রেখে যেতে হয়েছে।

নয় সদস্যের পরিবারের দায়িত্বে থাকা জেলে হাসানের পক্ষেও তাইজে চলে যাওয়া সম্ভব নয়। তাঁর প্রশ্ন, পরিবারের প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন, সেখানে শহর ছেড়ে যাওয়ার খরচ জোগাবেন কীভাবে

সংঘাতের মধ্যে বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনাও সামনে এসেছে। স্থানীয় এক সাংবাদিকের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ২২ সেপ্টেম্বর ভোরের আগে মোচার একটি বাড়িতে বোমা হামলায় একই পরিবারের ছয় সদস্য নিহত হন।

হুথি-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম এ হামলার জন্য সৌদি বিমান হামলাকে দায়ী করেছে। তবে সৌদি আরব এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।

সরকারপন্থী সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, ‘কিল বক্স’ ঘোষণার মূল লক্ষ্য হুথি যোদ্ধারা, সাধারণ বেসামরিক মানুষ নয়। তবে মোচা জেলার সরকারনিযুক্ত কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ জানিয়েছেন, বাস্তবে সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদে বের হওয়ার পথ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে মোচার স্বাস্থ্যব্যবস্থাতেও। হুথি বাহিনী শহরে প্রবেশের সময় আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা মেডেসাঁ সঁ ফ্রঁতিয়ের (এমএসএফ) জানিয়েছিল, মোচা জেনারেল হাসপাতাল ছাড়া প্রায় সব স্বাস্থ্যকেন্দ্রই কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। চিকিৎসাকর্মীদের বড় অংশ এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়। তখনও প্রায় ৩০ জন স্বাস্থ্যকর্মী দায়িত্বে ছিলেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার অর্থায়নে কর্মরত চিকিৎসকেরা বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। কিছু বাসিন্দার দাবি, হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং কিছু চিকিৎসা সরঞ্জাম সানা শহরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

মানবিক সহায়তাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ইয়েমেন সরকারের বাস্তুচ্যুতদের সহায়তায় কাজ করা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থের অভাবে যারা শহর ছাড়তে পারেননি, তাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারপন্থী পক্ষ হুথিদের বিরুদ্ধে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার অভিযোগও করেছে।

সব মিলিয়ে মোচার সাধারণ মানুষের সামনে এখন কঠিন এক বাস্তবতা। একদিকে যুদ্ধ ও হামলার ঝুঁকি, অন্যদিকে ঘর ছেড়ে পালানোর মতো অর্থ নেই। আবার বাড়ি ছেড়ে গেলে সম্পদ হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে।

নাবিলের মতো অনেকের কাছেই তাই নিরাপদ আশ্রয়ের চেয়ে নিজের ঘর আঁকড়ে থাকার সিদ্ধান্তই তুলনামূলক বাস্তব মনে হচ্ছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মোচার মানুষের এই অনিশ্চয়তা ও মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন