- ২১ আগস্ট, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
পারফরম্যান্স বাড়াতে নিষিদ্ধ বা বিতর্কিত ওষুধ ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে আয়োজন করা ‘এনহ্যান্সড গেমস’ নিয়ে শুরু থেকেই ছিল ব্যাপক আলোচনা। সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি, ক্রিপ্টো ও বায়োটেক দুনিয়ার বিনিয়োগকারীদের সমর্থন পাওয়া এই প্রতিযোগিতাকে অনেকে ‘স্টেরয়েড অলিম্পিক’ বলেও ব্যঙ্গ করেছেন। তবে আলোচিত সেই আয়োজন এবার বাণিজ্যিকভাবেও বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে।
মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত এই ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজক এনহ্যান্সড গ্রুপ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ ডলার নিট লোকসান হয়েছে। কোম্পানির প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই লোকসানের বড় একটি অংশ এসেছে এনহ্যান্সড গেমস আয়োজনের খরচ থেকে।
এনহ্যান্সড গেমসকে আয়োজকেরা প্রচলিত ক্রীড়া ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। পারফরম্যান্স-বর্ধক ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রচলিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতার নিষেধাজ্ঞা না থাকায় আয়োজনটি শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।
কিন্তু বাস্তবে প্রতিযোগিতাটি প্রত্যাশিত মাত্রায় সাড়া ফেলতে পারেনি। পুরো আয়োজন থেকে মাত্র একটি বিশ্ব রেকর্ড ভাঙা হয়। সেটিও সাঁতারে, যে খেলায় নিয়মিতই বিশ্ব রেকর্ড ভাঙার নজির রয়েছে।
ফলে আয়োজনটি ক্রীড়াক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার যে উচ্চাভিলাষী দাবি করা হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের যথেষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে।
এনহ্যান্সড গ্রুপ ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। চলতি বছরের শুরুতে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়ার সময় কোম্পানিটির মূল্যায়ন ছিল প্রায় ১২০ কোটি ডলার।
প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসা ডিজিটাল টেলিহেলথ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যক্তিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা দেওয়া। এর আওতায় পেপটাইড, টেস্টোস্টেরন ইনজেকশন, ওজন কমানোর জন্য GLP-1 এবং অন্যান্য চিকিৎসা পণ্য রয়েছে। কোম্পানির দাবি, তারা যেসব চিকিৎসা ও পণ্য বিক্রি করে সেগুলো অনুমোদিত।
তবে দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তিন মাসে কোম্পানিটির মোট আয় হয়েছে ১ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। এর বড় অংশই এসেছে এনহ্যান্সড গেমসকে কেন্দ্র করে পাওয়া স্পনসরশিপ থেকে। ফলে কোম্পানির মূল টেলিহেলথ ব্যবসা কতটা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে গেমসকে ভবিষ্যতে নিয়মিত বা বার্ষিক আয়োজন করার পরিকল্পনা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ একই ধরনের আয়োজন চালিয়ে যেতে হলে প্রতিষ্ঠানটিকে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে; নতুবা প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের লোকসান বহনের সক্ষমতা রাখতে হবে।
আর্থিক চাপের মধ্যেই এনহ্যান্সড গ্রুপের কার্যক্রমে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি ‘এনহ্যান্সড ব্রেকার্স’ নামে একটি অনলাইন সিরিজ চালু করেছে।
কোম্পানির ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ এনহ্যান্সড গেমস আয়োজনের তুলনায় এই সিরিজ পরিচালনায় খরচ অনেক কম। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে খেলোয়াড়দের প্রতিযোগিতায় রাখা, দর্শকদের যুক্ত রাখা, স্পনসরদের আগ্রহ ধরে রাখা এবং পারফরম্যান্স মেডিসিনকে সামনে রাখার সুযোগ থাকবে।
এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, বিপুল ব্যয়ের বড় ক্রীড়া আয়োজনের পরিবর্তে কম খরচে বছরজুড়ে দর্শক ও স্পনসরদের ধরে রাখার কৌশলে যেতে পারে প্রতিষ্ঠানটি।
এনহ্যান্সড গ্রুপের আর্থিক সংকটের বিপরীতে পেপটাইডভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ও বায়োটেক ব্যবসায় সামগ্রিকভাবে আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে সিলিকন ভ্যালিতে শরীরের সক্ষমতা বাড়ানো, বয়সের প্রভাব কমানো কিংবা ওজন নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে পেপটাইডভিত্তিক স্টার্টআপের সংখ্যা বাড়ছে।
প্রযুক্তি খাতে ‘বায়োহ্যাকিং’ প্রবণতার সঙ্গে এই ব্যবসার দ্রুত বিস্তার ঘটছে। সুপারপাওয়ার ও নোহো ল্যাবসের মতো প্রতিষ্ঠানও এই বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে।
তবে ব্যবসার সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়ন্ত্রক কাঠামো কতটা এগোতে পারছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সরকারকে নতুন ধরনের পেপটাইডভিত্তিক পণ্য ও চিকিৎসাসেবা নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা তৈরির চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) দীর্ঘদিন ধরে আইনি ও নিয়ন্ত্রক ধূসর অঞ্চলে থাকা কিছু পেপটাইডকে নতুনভাবে শ্রেণিবিন্যাসের উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও এর অর্থ এই নয় যে এসব উপাদান অবাধে বাজারজাত করার সুযোগ তৈরি হয়ে গেছে; আরও পর্যালোচনা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া রয়েছে।
পেপটাইড ও পারফরম্যান্স-বর্ধক চিকিৎসার বাজার যত বাড়ছে, এর স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিয়ন্ত্রণ নিয়েও তত আলোচনা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের নেতৃত্বে থাকা রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের স্বাস্থ্যনীতি ও বিভিন্ন বক্তব্য নিয়েও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন, দ্রুত সম্প্রসারিত এই বাজারে পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ভোক্তাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে সমালোচনা সত্ত্বেও পেপটাইডভিত্তিক ব্যবসায় বিনিয়োগ ও স্টার্টআপ কার্যক্রম থেমে নেই।
এনহ্যান্সড গেমসের আর্থিক ফলাফল তাই শুধু একটি ব্যর্থ ক্রীড়া আয়োজনের গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে দেখাচ্ছে, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতের উচ্চাভিলাষী ব্যবসায়িক ধারণা দ্রুত জনপ্রিয়তা পেলেও সেগুলোকে টেকসই বাণিজ্যিক মডেলে রূপ দেওয়া কতটা কঠিন। বিশেষ করে বিপুল ব্যয়ের আয়োজনের ক্ষেত্রে দর্শক, স্পনসর ও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখাই এখন এনহ্যান্সড গ্রুপের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।