Thursday, August 20, 2026

মাত্র ১ শতাংশ ভিসি সত্যিকার অর্থে সহায়ক: ট্রাভিস কালানিক


ছবিঃ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও উবারের প্রতিষ্ঠাতা ট্র্যাভিস কালানিক (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

উবারের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান নির্বাহী ট্রাভিস কালানিকের সঙ্গে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বা ভিসি বিনিয়োগকারীদের সম্পর্ক বরাবরই জটিল। একসময় যে বিনিয়োগকারীরা তাঁকে সিলিকন ভ্যালির অন্যতম প্রিয় উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতেন, তাঁদের সঙ্গেই পরে বোর্ডরুমে তীব্র দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিলেন তিনি। এবার পুরোনো সেই অভিজ্ঞতা সামনে এনে ভিসিদের ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা মন্তব্য করেছেন কালানিক।

সম্প্রতি ডেভিড সেনরার পডকাস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কালানিক বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ ভিসি একটি স্টার্টআপে বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মতো অবস্থানে থাকেন না। তাঁর মতে, কোনো ভিসির কাছে ন্যূনতম প্রত্যাশা হওয়া উচিত ‘ক্ষতি না করা’। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতায়, মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ ভিসি এই মানদণ্ড পূরণ করতে পারেন। আর সত্যিকার অর্থে সহায়ক ভিসির সংখ্যা আরও কম প্রায় ১ শতাংশ।

ভিসি ও উদ্যোক্তার সম্পর্ক বোঝাতে কালানিক একটি দাবার উদাহরণও দেন। তাঁর ভাষায়, একটি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হলেন সেই ‘চেস মাস্টার’, যিনি পুরো খেলাটি পরিচালনা করেন। অন্যদিকে ভিসি অনেকটা ‘চেসপ্রেমী’, যিনি মাঝেমধ্যে এসে খেলার অগ্রগতি দেখে যান।

কালানিকের মতে, এখানেই সম্পর্কের জটিলতা তৈরি হয়। একজন বিনিয়োগকারী কোম্পানিতে প্রভাব রাখতে চান, কিন্তু প্রতিষ্ঠাতা তাঁর পরামর্শ গ্রহণ না করলে অনেক ভিসির জন্য বিষয়টি মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বোর্ডে আসন ও নির্দিষ্ট কিছু ক্ষমতা থাকায় তাঁরা নিজেদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে পারেন।

তবে ভিসিদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকার পরামর্শ দেননি কালানিক। বরং উদ্যোক্তাদের এমনভাবে তহবিল সংগ্রহের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন, যাতে একাধিক বিনিয়োগকারী তাঁদের কোম্পানিতে অর্থ ঢালার জন্য প্রতিযোগিতায় নামে। তাঁর মতে, বর্তমানের দ্রুত পরিবর্তনশীল এআই বাজারে বিনিয়োগকারীদের সামনে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার ক্ষেত্রেও ভারসাম্য জরুরি।

খুব কম তথ্য দিলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাতে পারেন। আবার অতিরিক্ত বিস্তারিত পরিকল্পনা উপস্থাপন করলেও সমস্যা হতে পারে। কারণ এআই খাত এত দ্রুত বদলাচ্ছে যে বহু বছর পর কী হবে, তা অত্যন্ত নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা বরং উদ্যোক্তার অজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে।

ভিসিদের নিয়ে কালানিকের সংশয় অবশ্য সাম্প্রতিক কোনো অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হয়নি। উবারের শীর্ষ নির্বাহী থাকার সময় তিনি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁর সময়ে উবার প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের ভেঞ্চার বিনিয়োগ পায়।

কিন্তু ২০১৭ সালে উবারের পরিচালনা পর্ষদে বিনিয়োগকারী বিল গার্লির সঙ্গে তীব্র বিরোধে জড়িয়ে পড়েন কালানিক। শেষ পর্যন্ত প্রধান নির্বাহীর পদ ছাড়তে হয় তাঁকে। সেই ঘটনার পরও ভেঞ্চার ফার্ম বেঞ্চমার্কের প্রতি তাঁর ক্ষোভ পুরোপুরি কাটেনি। পডকাস্টে তিনি উদ্যোক্তাদের বেঞ্চমার্ক থেকে বিনিয়োগ নেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।

তবে তাঁর এই অবস্থান বেঞ্চমার্কের ব্যবসায় বড় কোনো প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হয় না। চলতি বছরের জুনে প্রতিষ্ঠানটি দুটি নতুন তহবিলের মাধ্যমে মোট ২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে।

উবারের বোর্ডরুমের সেই সংঘাত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শুধু বিনিয়োগকারীদের দায়ী করেননি কালানিক। বরং উদ্যোক্তাদের জন্য তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ নিজেকে সবসময় পরিস্থিতির শিকার হিসেবে দেখা যাবে না।

কালানিক বলেন, কোনো সংকট তৈরি হলে উদ্যোক্তাকে নিজের ভূমিকাও খতিয়ে দেখতে হবে। তাঁর মতে, ‘ভিকটিম মানসিকতা’ তৈরি হয়ে গেলে নিজের ভুলগুলো চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

নিজের ক্ষেত্রেও তিনি স্বীকার করেছেন, অসন্তুষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক সামলানোর ক্ষেত্রে তাঁর আরও দক্ষ হওয়া প্রয়োজন ছিল। একই সঙ্গে নিজের ব্যবস্থাপনার ধরনও যে সমস্যার অংশ ছিল, সেটিও এখন বুঝতে পারছেন বলে জানান তিনি।

উবারে নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো এখনো সঠিক বলে মনে করেন কালানিক। তাঁর দাবি, তিনি কোনো নিয়ম ভাঙেননি। কিন্তু তাঁর কর্মকাণ্ডের ‘অপটিকস’ বা বাইরে থেকে দেখানোর বিষয়টি সমস্যা তৈরি করেছিল।

তিনি বলেন, বড় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকলে প্রত্যাশা এবং নজরদারি দুটোই অনেক বেশি থাকে। কোনো সিদ্ধান্ত নিয়মসঙ্গত হলেও প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে অতিরিক্ত ঝুঁকির সীমার কাছাকাছি যাওয়া ঠিক নয় এই বিষয়টি তখন তিনি যথেষ্ট বুঝতে পারেননি।

কালানিকের মতে, তাঁর কঠোর ও আগ্রাসী ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির পেছনে ছিল আগের স্টার্টআপ রেড সোশের অভিজ্ঞতা। প্রতিষ্ঠানটি দাঁড় করানোর প্রথম চার বছর তিনি কোনো বেতন নেননি এবং একাধিকবার কোম্পানির অর্থ ফুরিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।

সেই কঠিন সময় তাঁকে অত্যন্ত নির্ভুল ও কঠোরভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে শিখিয়েছিল। কিন্তু উবার যখন প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, তখনও তিনি একই মানসিকতা ধরে রেখেছিলেন।

কালানিকের উপলব্ধি, একজন উদ্যোক্তা হিসেবে টিকে থাকার জন্য যে তীব্রতা তাঁর আগের কোম্পানিতে প্রয়োজন ছিল, উবারের মতো বিশাল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেই একই পদ্ধতি সবসময় কার্যকর নয়।

এদিকে ভিসিদের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের দ্বন্দ্ব নিয়ে কালানিকের মন্তব্যের মধ্যেই একই ধরনের পুরোনো অভিজ্ঞতা সামনে এনেছেন আরেক ধারাবাহিক উদ্যোক্তা মার্ক পিনকাস। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কোম্পানি সাপোর্ট ডটকমকে ঘিরে অ্যাকসেলের সঙ্গে অতীত বিরোধের কথা তুলে ধরেছেন।

এদিকে কালানিকের নতুন রোবোটিকস কোম্পানি অ্যাটমসের সাম্প্রতিক ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহে নেতৃত্ব দিয়েছে আন্দ্রেসেন হোরোভিটজ। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা বেন হোরোভিটজ অ্যাটমসের পরিচালনা পর্ষদেও যোগ দিয়েছেন।

ফলে একসময় ভেঞ্চার বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া কালানিক এখন আবার বড় অঙ্কের ভিসি অর্থ নিয়ে নতুন কোম্পানি গড়ছেন। তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্যে তাই শুধু পুরোনো ক্ষোভ নয়, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর সম্পর্ক কীভাবে আরও কার্যকর করা যায় সে অভিজ্ঞতাও উঠে এসেছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন