Sunday, October 4, 2026

ডেটা সেন্টার নির্মাণে সরকারি সংস্থার সঙ্গে আর গোপনীয় চুক্তি নয়: অ্যামাজন


ছবিঃ ডেটা সেন্টার নির্মাণকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশগত প্রভাব, পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণের ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে (সংগৃহীত)

স্টাফ রিপোর্ট: PNN 

নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের অনুমোদন পেতে সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে আর গোপনীয়তা চুক্তি বা নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) করবে না অ্যামাজন। প্রতিষ্ঠানটির ক্লাউড কম্পিউটিং শাখা অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাট গারম্যান এ তথ্য জানিয়েছেন।

ডেটা সেন্টার নির্মাণকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশগত প্রভাব, পানি ও বিদ্যুতের ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণের ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে এনডিএ ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানাল অ্যামাজন।

অ্যামাজনের একটি ব্লগ পোস্টে গারম্যান বলেন, ডেটা সেন্টার প্রকল্প নিয়ে জনমনে যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে, তার বড় একটি কারণ হলো তথ্য প্রকাশের ঘাটতি। তাঁর মতে, এসব প্রকল্প স্থানীয় অর্থনীতি ও সম্প্রদায়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুবিধাও তৈরি করে।

ডেটা সেন্টার নিয়ে সমালোচনার অন্যতম বিষয় হলো এনডিএ। সমালোচকদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা জানার আগেই সরকারি কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট পক্ষ গোপনীয়তা চুক্তিতে আবদ্ধ হন। ফলে প্রকল্পের আকার, পরিবেশগত প্রভাব ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জনসাধারণ পর্যাপ্ত তথ্য পান না।

পরিবেশকর্মী এরিন ব্রকোভিচও সম্প্রতি ডেটা সেন্টার নিয়ে আলোচনায় স্বচ্ছতার অভাবকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক প্রকল্পের অনুমোদন বা প্রস্তুতি এগিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয় মানুষ বিষয়টি জানতে পারেন।

এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে রাজনৈতিক ও জনমতভিত্তিক চাপও বাড়ছে। গারম্যানের দাবি, দেশজুড়ে শতাধিক ডেটা সেন্টার নির্মাণে স্থগিতাদেশ বা মরাটোরিয়াম বিবেচনা করা হচ্ছে। নিউইয়র্কে বড় ডেটা সেন্টারের অনুমোদন নিয়ে এক বছরের স্থগিতাদেশও ঘোষণা করা হয়েছে।

গারম্যানের আশঙ্কা, এ ধরনের বিধিনিষেধ বাড়তে থাকলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরির প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়তে পারে।

ডেটা সেন্টার নিয়ে আলোচনায় পানি ব্যবহারও অন্যতম বড় বিষয়। সার্ভার ঠান্ডা রাখতে বিপুল পরিমাণ পানির প্রয়োজন হতে পারে এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

গারম্যান অ্যামাজনের নিজস্ব তথ্য তুলে ধরে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মোট শিল্প খাতে ব্যবহৃত পানির তুলনায় ডেটা সেন্টারের সরাসরি পানি ব্যবহার মাত্র ০ দশমিক ৫ শতাংশ। তাঁর যুক্তি, গলফ কোর্স বা বাদাম চাষের মতো কয়েকটি খাতের তুলনায় এই ব্যবহার অনেক কম।

তবে সমালোচকদের মতে, শুধু ডেটা সেন্টারের ভেতরে সরাসরি পানি ব্যবহারের হিসাব দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত চিপ তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পানি ব্যবহারের হিসাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

গবেষকদের একটি অংশ মনে করেন, ডেটা সেন্টারের পানি ও জ্বালানি ব্যবহারের প্রকৃত প্রভাব বুঝতে আরও স্বতন্ত্র গবেষণা দরকার। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পানি ও জ্বালানি ব্যবহারের তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও এখনো পর্যাপ্ত অভিন্ন নিয়ম নেই বলে তাদের দাবি।

ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুতের দাম বাড়ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে গারম্যান এই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন।

তিনি বলেন, যেসব অঙ্গরাজ্যে বিপুলসংখ্যক ডেটা সেন্টার রয়েছে, সেসব জায়গার সবখানেই বিদ্যুতের দাম একইভাবে বাড়েনি। কোথাও দাম বেড়েছে, আবার কোথাও দাম কমেছে কিংবা বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম।

অ্যামাজনের এডব্লিউএস প্রধানের মতে, বিদ্যুতের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে অনেক জায়গায় পুরোনো বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং সময়মতো গ্রিড সম্প্রসারণ না হওয়াও বড় কারণ।

তবে স্বাধীন একটি পর্যবেক্ষক সংস্থার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ গ্রিডে এক বছরে বিদ্যুতের দামে ৭৬ শতাংশ বৃদ্ধির পেছনে ডেটা সেন্টারগুলোর চাহিদাকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো দূষণ। সমালোচকেরা অনেক সময় কোনো ডেটা সেন্টারকে দেওয়া সর্বোচ্চ নির্গমন অনুমতির পরিমাণ সামনে আনেন বলে মন্তব্য করেছেন গারম্যান।

টেক্সাসে অ্যামাজনের একটি প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রে বছরে সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৩০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের অনুমতি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বেশি হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

তবে গারম্যানের দাবি, জরুরি বিদ্যুৎ জেনারেটরগুলো সাধারণ সময়ে প্রায় ব্যবহারই করা হয় না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এগুলো প্রায় ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ সময় বন্ধ থাকে এবং মূলত বাধ্যতামূলক রক্ষণাবেক্ষণ পরীক্ষার জন্য বছরে প্রায় ১০ ঘণ্টা চালানো হয়।

ডেটা সেন্টার নিয়ে বিতর্কের মধ্যে অ্যামাজন এখন স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জনে স্বচ্ছতার ওপর জোর দেওয়ার চেষ্টা করছে। এনডিএ ব্যবহার বন্ধের ঘোষণার পাশাপাশি গারম্যান জানান, গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব এলাকায় অ্যামাজনের উল্লেখযোগ্য ডেটা সেন্টার কার্যক্রম রয়েছে, সেসব সম্প্রদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ১০০ কোটি ডলারের বেশি অবদান রেখেছে।

তবে এতে স্থানীয় মানুষের সন্দেহ পুরোপুরি দূর হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অবকাঠামোর দ্রুত বিস্তারের পাশাপাশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার সংকটও বাড়ছে।

ফলে শুধু অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থানের তথ্য প্রকাশ নয়, ডেটা সেন্টারের পানি, বিদ্যুৎ ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশই এখন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন