- ২১ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
যুক্তরাজ্যে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-এর পাঁচ কর্মীর বিরুদ্ধে করা মামলায় নতুন করে সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট আইনের প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালে বার্কলেস ব্যাংকের একটি শাখায় প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে প্রায় ২ লাখ ১২ হাজার পাউন্ডের ক্ষয়ক্ষতি করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়া ওই পাঁচ কর্মীর সাজা নির্ধারণের সময় তাদের অপরাধের সঙ্গে ‘সন্ত্রাসী সংযোগ’ যুক্ত করা হবে কি না, শুক্রবার তা নির্ধারণ হওয়ার কথা।
দোষী সাব্যস্ত পাঁচজন হলেন—২৮ বছর বয়সী ব্রেন্ডন ও’হাগান, ৩১ বছর বয়সী আমান্ডা কেলি, ৩১ বছর বয়সী হমিরা আতীকনিসার, ২৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ মালিক এবং ৭০ বছর বয়সী আলমা ইয়ানিভ। ২০২৪ সালের আগস্টে ল্যাঙ্কাশায়ারের বার্নলি শহরের একটি বার্কলেস ব্যাংক শাখায় সরাসরি প্রতিবাদ কর্মসূচি চালানোর সময় তারা ক্ষয়ক্ষতি করেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসে বার্কলেসের বিনিয়োগের প্রতিবাদেই ওই কর্মসূচি চালানো হয়েছিল।
প্রেস্টন ক্রাউন কোর্টে শুক্রবার এ বিষয়ে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ৪ সেপ্টেম্বর পাঁচ কর্মীর সাজা ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারিত রয়েছে। এর আগে আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তাদের বিরুদ্ধে হওয়া অপরাধকে ‘সন্ত্রাসী সংযোগযুক্ত’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে কি না।
ঘটনাটি নিয়ে বিতর্কের মূল কারণ হলো—অভিযুক্তদের বিচার ও দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সময় তাদের বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ ছিল না। এমনকি সে সময় প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে যুক্তরাজ্যে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবেও নিষিদ্ধ করা হয়নি। ফলে বিচার চলাকালে অভিযুক্ত পাঁচজন বা জুরি—কেউই জানতেন না যে পরবর্তী সময়ে তাদের সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত আইন বিবেচনায় আসতে পারে।
তবে রায় ঘোষণার পর বিচারক ফিলিপ প্যারি আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জানান, তিনি অপরাধগুলোর সঙ্গে ‘সন্ত্রাসী সংযোগ’ রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করতে চান।
এর আগে ব্রিস্টলের কাছে এলবিট সিস্টেমসের ফিলটন কারখানায় ক্ষয়ক্ষতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত চার প্যালেস্টাইন অ্যাকশন কর্মীকেও একই ধরনের আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় সন্ত্রাসী হিসেবে সাজা দেওয়া হয়েছিল। ওই ঘটনার প্রায় দুই বছর পর সাজা নির্ধারণের সময় বিষয়টি সামনে আসে।
পাঁচ কর্মীর পক্ষে থাকা আইনজীবী রাজ চাদা বলেন, ‘সন্ত্রাসী সংযোগ’ সংক্রান্ত আইন বহু বছর ধরেই যুক্তরাজ্যে বিদ্যমান। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই আইনের প্রয়োগ মূলত প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের কর্মীদের মামলাতেই দেখা যাচ্ছে।
তার ভাষ্য, সরাসরি প্রতিবাদ কর্মসূচির ক্ষেত্রে এ ধরনের আইন ব্যবহার অত্যন্ত অস্বাভাবিক। বিশেষ করে যেসব কর্মকাণ্ড প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নিষিদ্ধ হওয়ার আগেই সংঘটিত হয়েছে, সেসব ঘটনায় পরবর্তী সময়ে এই আইনি বিধান প্রয়োগ করা হচ্ছে—এটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
অভিযুক্তদের সমর্থকেরাও আদালতের এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। তাদের দাবি, কোনো সংগঠন পরবর্তী সময়ে নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে সেই সংগঠনের নিষিদ্ধ হওয়ার আগের কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একই ধরনের কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ন্যায়সংগত নয়।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাজ্য সরকার প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করে। এর ফলে সংগঠনটির সঙ্গে সম্পৃক্ততা বা প্রকাশ্যে সমর্থন জানানোও দেশটির আইনের আওতায় গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে।
মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারভিত্তিক সংগঠন ‘ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস’-এর দাবি, সংগঠনটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের প্রতি সমর্থন প্রকাশের অভিযোগে যুক্তরাজ্যে ৩ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের বয়স ৬০ বছরের বেশি।
লন্ডনের পার্লামেন্ট স্কয়ারে একাধিক গণবসতিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তার ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে বিক্ষোভকারীরা প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের প্রতি সমর্থন এবং গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
শুক্রবার প্রেস্টন ক্রাউন কোর্টের বাইরে পাঁচ কর্মীর সমর্থনে বিক্ষোভ করেন তাদের সমর্থকেরা। ‘ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস’ তাদের ‘বার্কলেস ফাইভ’ হিসেবে উল্লেখ করে জানায়, ব্যাংকের একটি শাখায় স্প্রে-পেইন্ট করার মতো অপরাধে তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে সাজা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অথচ বিচারের সময় তাদের বিরুদ্ধে কোনো সন্ত্রাসবাদী অভিযোগ ছিল না।
সংগঠনটির দাবি, জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতিবাদ করা কিংবা গণহত্যার বিরোধিতা করা সন্ত্রাসবাদ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত নয়।
আদালতের বাইরে উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ মালিকের মা ডাভ মালিক। ছেলের কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, তিনি তার সন্তানকে অন্যের কথা ভাবতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ভালো পৃথিবী তৈরির চেষ্টা করতে শিখিয়েছেন। ফিলিস্তিনিদের জন্য তহবিল সংগ্রহ, প্রচারণা এবং স্থানীয় ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ানোর কাজও তার ছেলে করেছেন বলে জানান তিনি।
এখন শুক্রবারের শুনানিতে আদালত কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে ৪ সেপ্টেম্বর সাজা ঘোষণার সময় এই পাঁচ কর্মীকে সাধারণ অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হবে, নাকি তাদের অপরাধের সঙ্গে ‘সন্ত্রাসী সংযোগ’ যুক্ত করে অতিরিক্ত কঠোর সাজা দেওয়া হবে।