Thursday, August 20, 2026

বিদেশি ‘অনুপ্রবেশ’ ঠেকাতে ইরানে কঠোর আইন, নজরদারিতে শিক্ষা-মিডিয়া-সংস্কৃতি


ছবিঃ ১৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ইরানের তেহরানের ভ্যালিয়াসর স্কোয়ারে এক ইরানি নারী ইরানের জাতীয় পতাকা ওড়াচ্ছেন (সংগৃহীত । আল জাজিরা /আবেদিন তাহেরকেনারেহ/ইপিএ)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN

বিদেশি ‘অনুপ্রবেশ’ ঠেকানোর কথা বলে নতুন একটি কঠোর আইনের মূলনীতি অনুমোদন করেছে ইরানের কট্টরপন্থি-নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্ট। প্রস্তাবিত আইনটি কার্যকর হলে বিদেশি দেশ ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, একাডেমিক সহযোগিতা, গণমাধ্যম, গবেষণা, বেসরকারি সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়তে পারে।

রোববার অনলাইনে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্টের অধিবেশনে বিলটির সাধারণ নীতিমালা অনুমোদন করা হয়। বুধবার এর হালনাগাদ ৩৩টি ধারার খসড়াও প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত আইন নয়। পার্লামেন্টে চূড়ান্ত অনুমোদনের পাশাপাশি দেশটির সাংবিধানিক অভিভাবক পরিষদ গার্ডিয়ান কাউন্সিলের অনুমোদনও প্রয়োজন হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

ইরানের কট্টরপন্থি এমপি রুহোল্লাহ নেজাবাতের দাবি, বিলটি চলতি বছরের শুরুতেই বিদেশি শক্তির ‘প্রভাব’ মোকাবিলার উদ্দেশ্যে অনুমোদিত হয়েছিল। তবে নতুন করে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা একটি সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে।

প্রস্তাবিত আইনে বিদেশি পক্ষের সঙ্গে প্রকাশনা, পরিসংখ্যান বিনিময়, বৃত্তি, বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা, গবেষণা, গণমাধ্যম, অর্থনৈতিক লেনদেন, আইনি পরামর্শ এবং শিল্প-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকেও ‘বিদেশি সম্পৃক্ততা’র আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।

বিদেশি দেশগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভিন্ন মাত্রার নজরদারি চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সবচেয়ে কঠোর নজরদারির তালিকায় রাখা হতে পারে।

এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ অনলাইন পোর্টাল চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদেশি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এমনকি প্রতিবেদন, তথ্য বা পরিসংখ্যান বিনিময়ের মতো বিষয়ও সেখানে নিবন্ধন করতে হতে পারে।

বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত কর্মশালা, প্রশিক্ষণ বা কোর্স আয়োজন করলে সংশ্লিষ্টদের কারাদণ্ডের মুখে পড়তে হতে পারে। এনজিও, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠনকেও বিদেশি অর্থ, চুক্তি, প্রশিক্ষণ বা অন্যান্য সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে নিবন্ধন কিংবা অনুমোদনের বাধ্যবাধকতার আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রমে ‘শত্রুর অনুপ্রবেশ’ সম্পর্কে সচেতনতা এবং মিডিয়া লিটারেসি যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কাউন্সিল অব দ্য কালচারাল রেভল্যুশনের মতামত নেওয়ার কথা রয়েছে।

বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা গবেষকদের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন বিধিনিষেধ তৈরি হতে পারে। এ নিয়ে ইরানের শিক্ষাবিদদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, আইনটি কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিলটির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশগুলোর একটি গণমাধ্যম-সংক্রান্ত বিধান। এতে বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ বা সহযোগিতার জন্য নিবন্ধন ও আগাম অনুমতির কথা বলা হয়েছে।

ইরান সরকারের ‘বিরোধী’ বা ‘শত্রুভাবাপন্ন’ হিসেবে বিবেচিত কোনো বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে অনুমতি ছাড়া সাক্ষাৎকার বা কথোপকথন করলেও শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

এ ছাড়া বিদেশি নির্দেশনায় ইচ্ছাকৃতভাবে এমন তথ্য, বিশ্লেষণ বা নীতিগত পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে, যা দেশের নিরাপত্তা বা রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করে, সর্বোচ্চ ৩০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিদেশি অর্থায়ন বা নির্দেশনায় তৈরি চলচ্চিত্র, গান, বইসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকেও আইনের আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। ধর্মীয় বিধান নিয়ে প্রশ্ন তোলে, ইরানের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরে বা ‘ইসলামবিরোধী সংস্কৃতি’ প্রচার করে এমন কোনো কাজের বিরুদ্ধে জরিমানা, পেশাগত নিষেধাজ্ঞা এবং সংশ্লিষ্ট কাজ বন্ধ করে দেওয়ার মতো শাস্তির কথা বলা হয়েছে।

তবে সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় এবং রাজনৈতিক কর্মকর্তাদের কিছু বিদেশি কর্মকাণ্ডকে নিবন্ধন ব্যবস্থার বাইরে রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে ইরানের সরকার। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের আইনি বিষয়ক উপদেষ্টা মাজিদ আনসারি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, সরকার এই আইনের ‘স্পষ্ট বিরোধিতা’ করছে।

তার ভাষ্য, আইনটি বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডে গুরুতর সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে এবং ইরানি শিক্ষাবিদদের আন্তর্জাতিক সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত করবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ইরানের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশটির দীর্ঘদিনের ‘ব্রেন ড্রেন’ বা মেধাপাচার আরও তীব্র হতে পারে।

আনসারি মনে করেন, প্রস্তাবিত বিধানগুলো সংবিধান, নাগরিক অধিকার এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হতে পারে।

প্রস্তাবিত আইন নিয়ে ইরানের গণমাধ্যমেও দেখা দিয়েছে মতবিরোধ। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল-সংশ্লিষ্ট নূরনিউজ বলেছে, অনুপ্রবেশ ঠেকানোর পরিবর্তে এই আইন গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা আরও সংকুচিত করতে পারে।

অন্যদিকে কট্টরপন্থি কেহান পত্রিকা বিলটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের দাবি, যাদের বিদেশের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক নেই, তাদের এই আইন নিয়ে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবির জাম-ই জামও প্রস্তাবটিকে ‘বিপ্লবী সিদ্ধান্ত’ হিসেবে প্রশংসা করেছে।

সংস্কারপন্থি শার্ঘ পত্রিকা অবশ্য এর সমালোচনা করে আইনটিকে ‘যোগাযোগবিরোধী আইন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক কামবিজ নোরুজি বলেছেন, প্রস্তাবিত আইনটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার মতে, পার্লামেন্টে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে বিলটির অনেক ধারা পরিবর্তিত হতে পারে। তবে আইনপ্রণেতারা যে এত বিস্তৃত বিধিনিষেধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, সেটিই উদ্বেগের বিষয়।

ইরানের এক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষকও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, অনেক বিধান বাস্তবে প্রয়োগ করা কঠিন হতে পারে। তারপরও এমন আইন ভবিষ্যতে আরও কঠোর বিধিনিষেধ তৈরির নজির সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও একাডেমিক মহলে এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ইরানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে প্রস্তাবিত আইন নিয়ে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন।

সব মিলিয়ে বিদেশি ‘অনুপ্রবেশ’ মোকাবিলার নামে প্রস্তাবিত এই আইন ইরানের নিরাপত্তা কাঠামো আরও কঠোর করার পাশাপাশি নাগরিক স্বাধীনতা, শিক্ষা, গবেষণা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে এমন আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।


Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন