- ১৮ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনে বিকল্প পথ হিসেবে আর্কটিক মহাসাগরকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে চীন। দেশটির নতুন এই নৌপথের নাম দেওয়া হয়েছে ‘আইস সিল্ক রোড’।
চীনা কনটেইনার পরিবহন প্রতিষ্ঠান সি লিজেন্ড সম্প্রতি নতুন এই রুটটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। পথটি চীনের পূর্বাঞ্চলীয় বন্দর নিংবো থেকে শুরু হয়ে রাশিয়ার নর্দার্ন সি রুট ধরে আর্কটিক সার্কেল অতিক্রম করবে। এরপর উত্তর সাগর হয়ে যুক্তরাজ্যের পূর্বাঞ্চলের ফেলিক্সস্টো বন্দরে পৌঁছাবে।
নতুন রুটটি নিয়ে গত বছরের অক্টোবরে পরীক্ষামূলক যাত্রা চালানো হয়েছিল। চীনা সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই যাত্রায় সময় লেগেছিল প্রায় ২০ দিন। তুলনায় সুয়েজ খাল হয়ে একই ধরনের যাত্রায় প্রায় ৪০ দিন এবং আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে গেলে প্রায় ৫০ দিন সময় লাগতে পারে।
সি লিজেন্ডের কর্মকর্তাদের মতে, কম তাপমাত্রা ও তুলনামূলক কম দূরত্বের কারণে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, সৌর প্যানেলের মতো তাপমাত্রা-সংবেদনশীল এবং দ্রুত সরবরাহ প্রয়োজন এমন পণ্য পরিবহনে এই রুট কার্যকর হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আর্কটিক রুটে যাত্রার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও এটিকে এখনই সুয়েজ খালের স্থায়ী বিকল্প হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো আবহাওয়া ও বরফ।
উষ্ণ মৌসুমে আর্কটিকের বরফ কমে যাওয়ায় কিছু সময়ের জন্য নৌযান চলাচল তুলনামূলক সহজ হয়। কিন্তু শীতকালে বরফের কারণে রুটটি ব্যবহার কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সারা বছর নির্ভরযোগ্যভাবে এই পথে পণ্য পরিবহন করা এখনো সম্ভব নয়।
নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ডিলান লোহের মতে, আর্কটিক রুটকে আপাতত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের বিকল্পের চেয়ে একটি ‘পরিপূরক’ ব্যবস্থা হিসেবে দেখা বেশি বাস্তবসম্মত। বরফ গলার সময়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এখানে অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।
এ ছাড়া পরিবেশগত উদ্বেগও রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ দ্রুত কমে যাওয়ায় নতুন নৌপথের সুযোগ তৈরি হলেও সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বাড়ানো পরিবেশের ওপর আরও চাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করছেন পরিবেশবাদীরা।
চীনের ‘আইস সিল্ক রোড’-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাশিয়ার নর্দার্ন সি রুট। এই নৌপথে চলাচলের অনুমতি দেয় রাশিয়ার নর্দার্ন সি রুট প্রশাসন, যা দেশটির রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক প্রতিষ্ঠান রোসাটমের অধীনে পরিচালিত।
ফলে রুটটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে চীনসহ অন্যান্য দেশের জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হবে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্কের অবনতিও এই রুটকে ঘিরে রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াংয়ের মতে, নর্দার্ন সি রুট নিয়ন্ত্রণ করে রাশিয়া। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে চীনই অন্যতম দেশ, যারা বিকল্প হিসেবে এই পথ বাস্তবসম্মতভাবে ব্যবহার করতে পারে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে এ পথে বাণিজ্য পরিচালনায় অন্য দেশের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নতুন নৌপথকে শুধু বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, নিয়মিত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আর্কটিক অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতি আরও জোরালো করতে পারে।
চীন ২০১৩ সাল থেকেই আর্কটিক কাউন্সিলের পর্যবেক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চলটির প্রাকৃতিক সম্পদ ও নৌপথের প্রতি বেইজিংয়ের আগ্রহ রয়েছে। নতুন রুট চালু হলে সেই আগ্রহ আরও বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ নিতে পারে।
অন্যদিকে রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে নর্দার্ন সি রুটকে কাজে লাগাতে চাইছে। ফলে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে আর্কটিকভিত্তিক বাণিজ্যিক সহযোগিতা আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নৌপথে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও এলএনজি পরিবহন হয়। অন্যদিকে বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের সঙ্গে বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয়েছে।
এসব পথে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় অনেক জাহাজকে বিকল্প ও দীর্ঘ পথ বেছে নিতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময় দুটোই বাড়ছে। এই বাস্তবতায় আর্কটিকের তুলনামূলক ছোট দূরত্বের রুটটি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট চীনের নতুন রুটের গুরুত্ব বাড়ালেও এটি রাতারাতি বৈশ্বিক বাণিজ্যের চিত্র বদলে দেবে এমনটা মনে করার কারণ নেই।
সিঙ্গাপুরের বিশ্লেষক ডিলান লোহের ভাষায়, চীনের নতুন রুটটি এখন মূলত একটি ‘ঝুঁকি মোকাবিলার বিকল্প ব্যবস্থা’, পুরোপুরি প্রচলিত নৌপথের পরিবর্তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নয়। পরিবেশ, খরচ, নির্ভরযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য আরও সময় প্রয়োজন।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও জনপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক আলেহান্দ্রো রেয়েস অবশ্য মনে করেন, এর কৌশলগত প্রভাব আরও বড় হতে পারে। তাঁর মতে, নিয়মিত বাণিজ্যিক চলাচল আর্কটিক অঞ্চলকে চীন-রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আরও গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো, আর্কটিক রুট সুয়েজ খালকে সরিয়ে দেবে না। বরং ভবিষ্যতে এটি এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে যার অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও ক্রমেই বাড়বে।