- ২০ আগস্ট, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ, ম্যানেজিং কমিটির কার্যক্রম এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের তুলনায় কোনো কোনো খণ্ডকালীন শিক্ষককে বেশি বেতন দেওয়ার পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা ও ঈদ বোনাস দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সম্প্রতি এসব অভিযোগ তুলে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) একাধিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষকও প্রশ্ন তুলেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি বিষয়ে তদন্ত চলছে। তবে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক অনিয়ম নিয়ে এখনো তদন্ত শুরু হয়নি। যথাযথ প্রক্রিয়ায় অভিযোগ এলে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির বেশ কয়েকজন খণ্ডকালীন শিক্ষকের বেতন ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে। অথচ অনেক এমপিওভুক্ত শিক্ষক প্রতিষ্ঠান থেকে যে অংশের বেতন পান, তা এর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
একজন খণ্ডকালীন শিক্ষিকার মাসিক বেতন প্রথমে ৭ হাজার টাকা থাকলেও পরে তা ১৫ হাজার এবং চলতি বছরে ২২ হাজার টাকা করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে আরও কয়েকজন খণ্ডকালীন শিক্ষকের বেতন বাড়ানো হয়েছে।
শুধু বেতন নয়, খণ্ডকালীন শিক্ষকদের বৈশাখী ভাতা ও ঈদ বোনাস দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিএডবিহীন খণ্ডকালীন শিক্ষকদের ২ হাজার ৫০০ টাকা বৈশাখী ভাতা এবং ১২ হাজার ৫০০ টাকা ঈদ বোনাস দেওয়া হয়েছে। বিএডধারীদের ক্ষেত্রে এ দুটি ভাতার পরিমাণ যথাক্রমে ৩ হাজার ২০০ ও ১৬ হাজার টাকা।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তহবিল থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে অষ্টম গ্রেডের এক সিনিয়র শিক্ষক জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী প্রায় ৩২ হাজার ৩৯০ টাকা বেসিক বেতন পেতেন। এমপিও অংশ থেকে কর্তনের পর প্রায় ৩২ হাজার ৩০০ টাকা উত্তোলনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তহবিল থেকে তাকে প্রায় ৪৬ হাজার ৭৯৯ টাকা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ফলে এমপিও ও প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া অর্থ মিলিয়ে ওই শিক্ষকের মাসিক প্রাপ্তি প্রায় ৭৯ হাজার টাকা হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব তহবিল থেকে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা ও অনুমোদন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রতিষ্ঠানটিতে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগে নীতিমালা অনুসরণ না করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১৫ সালের পর নিয়োগ পাওয়া বেশ কয়েকজন খণ্ডকালীন শিক্ষককে দীর্ঘদিন ধরে রাখা হয়েছে এবং চলতি বছরের এপ্রিল থেকে তাদের বেতন বাড়ানো হয়েছে।
একই সঙ্গে এনটিআরসিএর ই-রিকুইজিশনে শূন্য পদের সঠিক তথ্য না দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এতে কৃত্রিম শিক্ষক সংকট তৈরি করে খণ্ডকালীন শিক্ষকদের চাকরি অব্যাহত রাখার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে দুজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক থাকার পরও পাঁচজন খণ্ডকালীন শিক্ষককে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। অথচ ওই শাখায় শিক্ষার্থীর সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় কম বলে দাবি অভিযোগকারীদের।
প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সদস্যপদ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একজন অভিভাবক সদস্যের সন্তান প্রতিষ্ঠান ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার পরও তিনি কয়েক মাস কমিটিতে বহাল ছিলেন এবং সভায় অংশ নিয়েছেন।
এ ছাড়া ম্যানেজিং কমিটির সভা আয়োজনের নামে প্রতিবার ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত সম্মানী ও আপ্যায়ন বাবদ ব্যয় দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, এ ধরনের ব্যয়ের বৈধতা এবং অর্থের উৎস ও ব্যবহার নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজে গাইড বই কোম্পানির কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে একটি গাইড বই কোম্পানির কাছ থেকে প্রায় ৩ লাখ টাকা এবং ২০২৬ সালে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকার বেশি অর্থ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষক তহবিল গঠনের কথা বলে এসব অর্থ নেওয়া হলেও এর হিসাব ও ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গাইড বই কিনতে উৎসাহিত বা বাধ্য করা এবং ওই বই অনুসরণ করে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরির অভিযোগও রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। বিভিন্ন খাতে ভুয়া বিল-ভাউচার ব্যবহার করে ব্যয় দেখানো এবং সংশ্লিষ্ট কমিটির কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়াই হিসাব সম্পন্ন করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীরা এসব বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব, বিল-ভাউচার, রেজুলেশন ও অন্যান্য আর্থিক নথি পরীক্ষা করে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষক বলেন, খণ্ডকালীন শিক্ষকদের চাকরি দীর্ঘায়িত করতে শূন্য পদের তথ্য গোপন করা হয়ে থাকতে পারে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী না থাকা সত্ত্বেও একাধিক শাখা চালু রাখার অভিযোগও করেন তিনি।
আরেক শিক্ষক বলেন, প্রতিষ্ঠানের অর্থ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, অবকাঠামো ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় হওয়ার কথা। সেখানে বেতন-ভাতা, নিয়োগ, গাইড বই, ম্যানেজিং কমিটির সভা কিংবা কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার প্রভাব শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার ওপর পড়ে। বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জাফর উল্লাহর সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি। পরে অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ এখনো তাঁর দপ্তরে পৌঁছেনি। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন হওয়ায় এতে কারও বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আর্থিক হিসাব ও নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের পরই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।