- ২১ আগস্ট, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। রাজশাহী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৬ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার বড় একটি অংশ ঘটেছে ক্যাম্পাসের আবাসিক হলের বাইরে বিভিন্ন মেস, ছাত্রাবাস ও ভাড়া বাসায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও জনসংযোগ দপ্তরের তথ্য এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
সর্বশেষ গত ১০ জুন ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এর আগে সম্প্রতি গণিত বিভাগের এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করায় ক্যাম্পাসে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সংকটকালীন সহায়তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর ফলিত গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী ফিরোজ কবীরের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ওই সময়ে এমন ঘটনার ধারাবাহিকতা সামনে আসে। এরপর ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর নিজ বাড়িতে মারা যান নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী দেবজ্যোতি বসাক পার্থ।
২০২১ সালে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মোবাসসিরা তাহসিন ইরা এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ইমরুল কায়েসের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
পরের বছরও একাধিক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। ২০২২ সালে বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ইশতিয়াক মাহমুদ, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সোহাগ খন্দকার, ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া তাবাসসুম, নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল মাওয়া দিশা এবং অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ছন্দা রায়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাইমা আরাবী ইভার মৃত্যু হয়। একই বছরের জুনে লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী তানভীর ইসলাম রিতু এবং সেপ্টেম্বরে সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী ফুয়াদ আল খতিবের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
এরপর ২০২৫ সালে ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সিফাতুল্লাহ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী সোনিয়া সুলতানা এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী লামিসা নওরীন পুষ্পিতার মৃত্যু হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী জুবাইদা ইসলাম ইতির মৃত্যুর পর সর্বশেষ জুনে মাহফুজুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের বাইরে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন। মেহেরচণ্ডী, মির্জাপুর, বিনোদপুর ও আমজাদের মোড় এলাকার বিভিন্ন মেস ও ছাত্রাবাসে এমন ঘটনা ঘটেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হলের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন আচরণ বা মানসিক অবস্থার পরিবর্তন অনেক সময় সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরের বাইরে থেকে যায়। ফলে কোনো শিক্ষার্থী গুরুতর মানসিক সংকটে পড়লে দ্রুত তা শনাক্ত করে সহায়তা দেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মাজিদুল ইসলাম বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের আগেই শনাক্ত করা জরুরি। এ জন্য নিয়মিত যোগাযোগ, পেশাদার কাউন্সেলিং এবং হলের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্যও সহায়তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর্থিক সংকট, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ও একাকিত্বসহ নানা বিষয় একজন শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কোনো আত্মহত্যার ঘটনার পেছনে নির্দিষ্ট কারণ জানতে হলে প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসক অধ্যাপক মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব বলেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকটের পেছনে সামাজিক, পারিবারিক, মানসিক ও আর্থিক বিভিন্ন বিষয় কাজ করতে পারে। সম্পর্কের সমস্যা, পারিবারিক কলহ, আর্থিক সংকট, একাকিত্ব ও হতাশা থেকেও কারও মধ্যে আত্মহানির চিন্তা তৈরি হতে পারে।
তিনি শিক্ষার্থীদের পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার পরামর্শ দেন। দীর্ঘদিন হতাশা বা বিষণ্ণতা অনুভূত হলে দ্রুত পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহায়তা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
একের পর এক শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যুতে ক্যাম্পাসে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং ব্যবস্থা আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি বিভাগ ও আবাসিক হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।
হল ছাড়াও মেস ও ছাত্রাবাসে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি সময়ে সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবিও উঠেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীরা হলে থাকছেন নাকি মেসে—এটিকে আত্মহত্যার সরাসরি কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, মানসিক সমস্যা, হতাশা, প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার অনুভূতি এবং সম্পর্কজনিত নানা সংকট শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের সুস্থ ও ইতিবাচক পরিবেশের মধ্যে রাখতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সেলের মাধ্যমে কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রক্টর অফিসও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন নিজেকে গুটিয়ে নিলে, আচরণে বড় পরিবর্তন দেখা দিলে বা গভীর হতাশার কথা জানালে বিষয়টি অবহেলা না করে সহানুভূতির সঙ্গে পাশে দাঁড়ানোই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ।