Tuesday, August 18, 2026

বেসরকারি স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠায় মানতে হবে তিন ধাপ, রয়েছে জমি-জনসংখ্যাসহ নানা শর্ত


ছবিঃ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থী (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা 

নিজের এলাকায় একটি বেসরকারি স্কুল বা কলেজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অনেকেরই থাকে। তবে শুধু জমি ও ভবন থাকলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর অনুমতি মেলে না। প্রতিষ্ঠান স্থাপন, পাঠদানের অনুমতি এবং একাডেমিক স্বীকৃতি এই তিনটি ধাপ ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করতে হয়। নির্ধারিত কোনো একটি ধাপ বাদ পড়লে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ থাকে না।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক) স্থাপন, পাঠদান ও একাডেমিক স্বীকৃতি প্রদান নীতিমালা-২০২২ (সংশোধিত-২০২৩)’ অনুযায়ী, বেসরকারি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ মাধ্যমিক মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় নির্দিষ্ট নিয়ম ও শর্ত অনুসরণ করতে হয়।

নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রথম কাজ হলো স্থাপনের অনুমতি নেওয়া। এ জন্য নির্ধারিত ফরমে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর আবেদন করতে হয়।

আবেদনের সঙ্গে আবেদনকারীর পরিচয় ও জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত কপি, জমির মালিকানা ও খতিয়ানের তথ্য, মৌজা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণসহ প্রয়োজনীয় দলিলপত্র দিতে হয়।

জমি দান বা হস্তান্তরের মাধ্যমে পাওয়া হলে নিবন্ধিত দলিলের পাশাপাশি সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্তৃক দেওয়া মালিকানা ও স্বত্বের প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হয়। নির্ধারিত ফরমে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে অঙ্গীকারনামাও দাখিল করতে হয়।

এ ছাড়া প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানের আশপাশে থাকা অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দূরত্ব উল্লেখ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সনদ এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার জনসংখ্যার সনদ দিতে হয়। প্রতিষ্ঠানটি বালক, বালিকা নাকি সহশিক্ষা এবং বাংলা নাকি ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত হবে, সেটিও আবেদনে স্পষ্ট করতে হয়।

প্রতিষ্ঠানের অবস্থান অনুযায়ী নিকটবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার বিধান রয়েছে। সিটি করপোরেশন, শিল্প এলাকা ও প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে দূরত্ব কমপক্ষে ১ কিলোমিটার এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ২ কিলোমিটার হতে হয়।

মফস্বল এলাকায় নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের জন্য দূরত্ব কমপক্ষে ২ কিলোমিটার এবং উচ্চ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ৪ কিলোমিটার নির্ধারিত রয়েছে।

জনসংখ্যার ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট মানদণ্ড। নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকায় কমপক্ষে ১০ হাজার জনসংখ্যা থাকতে হয়। উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ৬৫ হাজার এবং উচ্চ মাধ্যমিক মহাবিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ৭৫ হাজার জনসংখ্যা।

তবে চর, পাহাড়ি, হাওর-বাঁওড়, দ্বীপ বা বিশেষ ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের এলাকা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এসব শর্ত শিথিল করার সুযোগ রয়েছে।

আবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা বা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে ইউএনওর মতামতসহ প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়।

প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর মঞ্জুরি কমিটি সুপারিশ করে। এরপর বোর্ডের সভায় অনুমোদনের মাধ্যমে স্থাপনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

স্থাপনের অনুমতি পাওয়ার পরই প্রতিষ্ঠান চালু করা যাবে না। পরবর্তী ধাপে জমির নামজারি, ভবন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আসবাব প্রস্তুত করে পাঠদানের অনুমতি নিতে হয়।

এ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের নামে জমির মালিকানা ও নামজারি সম্পন্ন থাকা জরুরি। ভাড়া করা ভবনে পাঠদানের অনুমতি দেওয়ার সুযোগ নেই বলে নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে।

জমির পরিমাণও প্রতিষ্ঠানের ধরন ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। মফস্বলে নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ন্যূনতম ০.৫০ একর, মাধ্যমিকের জন্য ০.৭৫ একর এবং উচ্চ মাধ্যমিকের জন্য ১ একর জমি প্রয়োজন।

প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় এ পরিমাণ যথাক্রমে ০.৩০, ০.৫০ ও ০.৭৫ একর। সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রয়োজন যথাক্রমে ০.২০, ০.২৫ ও ০.৩৫ একর জমি।

শুধু জমি থাকলেই পাঠদানের অনুমতি মিলবে না। প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ, অফিস, লাইব্রেরি, টয়লেট, কমন রুমসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অন্তত তিনটি শ্রেণিকক্ষ, একটি শিক্ষক ও অফিস কক্ষ, একটি লাইব্রেরি, তিনটি টয়লেট এবং একটি কমন রুম থাকার কথা বলা হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রয়োজন পাঁচটি শ্রেণিকক্ষ, দুটি অফিস কক্ষ, একটি লাইব্রেরি, চারটি টয়লেট ও দুটি কমন রুম।

উচ্চ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব ও পৃথক ওয়াশরুম থাকতে হবে। মফস্বল এলাকায় খেলার মাঠ, সুপেয় পানি, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য র‍্যাম্প সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রযুক্তি ও বইয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট মানদণ্ড। নিম্ন মাধ্যমিকে চারটি কম্পিউটার ও অন্তত এক হাজার বই, মাধ্যমিকে ছয়টি কম্পিউটার ও দুই হাজার বই এবং উচ্চ মাধ্যমিকে সর্বোচ্চ ১৫টি পর্যন্ত কম্পিউটার ও তিন হাজার বই রাখার শর্ত রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে সাধারণ ও সংরক্ষিত তহবিল রাখতে হয়। নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য সাধারণ তহবিল ১ লাখ ও সংরক্ষিত তহবিল ২ লাখ টাকা। মাধ্যমিকের জন্য এ দুটি তহবিল যথাক্রমে দেড় লাখ ও ৩ লাখ টাকা।

উচ্চ মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সাধারণ তহবিল ২ লাখ এবং সংরক্ষিত তহবিল ৪ লাখ টাকা রাখার বিধান রয়েছে।

নির্ধারিত ফরমে আবেদন করার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আবারও সরেজমিন পরিদর্শন করবে। পরিদর্শন প্রতিবেদন ও মঞ্জুরি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট মেয়াদে পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হবে।

অনুমতি পাওয়ার পর বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) থেকে EIIN এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রতিষ্ঠান কোড সংগ্রহ করতে হবে। পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থাপনা বা ম্যানেজিং কমিটি গঠনের বিধানও রয়েছে।

পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং নির্ধারিত ফলাফল অর্জনের পর একাডেমিক স্বীকৃতির জন্য আবেদন করা যায়।

নীতিমালা অনুযায়ী, পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার এক থেকে তিন বছরের মধ্যে নির্ধারিত ফরমে স্বীকৃতির আবেদন করতে হয়। এ সময় প্রতিষ্ঠানে স্তরভেদে ন্যূনতম শিক্ষার্থীও থাকতে হবে।

মফস্বল এলাকায় নিম্ন মাধ্যমিকে অন্তত ৯০ জন এবং মাধ্যমিকে ১৫০ জন শিক্ষার্থী থাকার শর্ত রয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩২০ থেকে ৪২০ জন পর্যন্ত হতে হয়। জেলা সদর ও সিটি করপোরেশন এলাকায়ও স্তর অনুযায়ী আলাদা শিক্ষার্থীসংখ্যার মানদণ্ড রয়েছে।

একাডেমিক স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা নয়, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ। মফস্বল এলাকায় সংশ্লিষ্ট পাবলিক পরীক্ষায় অন্তত ৩০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেওয়া এবং গড়ে ৫০ শতাংশ পাসের হার অর্জনের শর্ত রয়েছে।

জেলা সদর এলাকায় প্রয়োজন ৫৫ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬০ শতাংশ পাসের হার।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানকে সরকার অনুমোদিত শিক্ষক-কর্মচারীর জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) নিবন্ধন ও সুপারিশের বিষয়টি প্রযোজ্য।

সব শর্ত পূরণ করে পরিদর্শন প্রতিবেদন ও পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একাডেমিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই স্বীকৃতির মেয়াদ তিন বছর।

মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ছয় মাস আগে স্বীকৃতি নবায়নের জন্য আবেদন করতে হয়। ফলে বেসরকারি স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শুধু প্রাথমিক অনুমতি পাওয়াই শেষ কথা নয়; নিয়মিতভাবে নীতিমালার শর্ত পূরণ করাও বাধ্যতামূলক।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্ধারিত ধাপগুলো সম্পর্কে আগে থেকেই পরিষ্কার ধারণা নিয়ে জমি, অবকাঠামো, জনসংখ্যা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসংক্রান্ত সব শর্ত যাচাই করে উদ্যোগ নিলে পরবর্তী সময়ে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জটিলতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন