- ২২ আগস্ট, ২০২৬
PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা
রাজধানীর নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ কমানো এবং ঢাকার আশপাশের এলাকার মানুষের জন্য মানসম্মত সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে নেওয়া ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প নয় বছরেও শেষ হয়নি। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। দুই দফা সংশোধনের পর বর্তমানে এর মেয়াদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০২৭ সালের জুনে।
একই সময়ে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়েছে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। ৬৭৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত প্রকল্পটির বর্তমান ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮০৩ কোটি ৭৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ১০টি প্রতিষ্ঠানের কোনো একটিরও নির্মাণকাজ শতভাগ শেষ হয়নি। এর মধ্যে তিনটি বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের কাজ এখনো শুরুই হয়নি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) ২০২৬ সালের নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় প্রকল্পটির ধীরগতি, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, সম্ভাব্যতা যাচাই না করা, প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতি এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার নানা সীমাবদ্ধতার বিষয় উঠে এসেছে।
প্রকল্পটির আওতায় ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মোট ১০টি সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনার সুযোগ পাবে বলে প্রকল্পে ধরা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো সাভারের হেমায়েতপুরের বিলামালিয়া, নবীনগরের বাঁশবাড়ী-পাথালিয়া, ধামরাইয়ের লাকুরিয়াপাড়া, কেরানীগঞ্জের পশ্চিমদি, আশুলিয়ার পূর্ব-নরসিংহপুর, নারায়ণগঞ্জের খোর্দ্দঘোষপাড়া ও জালকুড়ি, রূপগঞ্জের পূর্বাচল এবং ঢাকার সাঁতারকুল ও খিলখেত এলাকার সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ১০ তলা একাডেমিক ভবন, জিমনেশিয়াম, শহীদ মিনার, অভ্যন্তরীণ সড়ক, সীমানাপ্রাচীরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কথা রয়েছে। পাশাপাশি কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ল্যাবরেটরি, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক সরঞ্জাম, আসবাবপত্র এবং বই সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে।
কিন্তু প্রকল্প অনুমোদনের প্রায় এক দশক পরও এসব সুবিধার কোনোটিই পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি।
আইএমইডির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ১০টি একাডেমিক ভবনের মধ্যে চারটির নির্মাণ অগ্রগতি ৮৮ থেকে ৯৩ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। দুটি ভবনের কাজ এগিয়েছে ৩০ ও ৩৩ শতাংশ এবং আরেকটির অগ্রগতি মাত্র ১০ শতাংশ।
অন্যদিকে তিনটি ভবনের নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি। এর একটি প্রতিষ্ঠানের জমি হস্তান্তর হলেও ঠিকাদারি চুক্তির জন্য দরপত্র মূল্যায়ন চলছে। অন্য দুটি প্রতিষ্ঠানের জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াই শেষ হয়নি।
নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ থাকায় কোনো প্রতিষ্ঠানেই প্রকল্পের আওতায় পরিকল্পিত একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। ফলে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ঢাকার সন্নিকটবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা এখনো বাস্তবে পূরণ হয়নি।
প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ হিসেবে জমি নির্বাচন ও অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতাকে চিহ্নিত করেছে আইএমইডি।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রকল্প গ্রহণের আগে কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়নি। ফলে জমির মালিকানা, মামলা-মোকদ্দমা, অধিগ্রহণের সম্ভাব্য জটিলতা এবং নির্ধারিত স্থানে নির্মাণকাজ করা সম্ভব কি না এসব বিষয় শুরুতেই যথাযথভাবে যাচাই করা যায়নি।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা ও মালিকানা জটিলতার কারণে নির্ধারিত জমি বাতিল করে নতুন জায়গা খুঁজতে হয়েছে। পূর্ব-নরসিংহপুরে অধিগ্রহণের অর্থ পরিশোধের পরও জমি বুঝে পাওয়া যায়নি। বিলামালিয়া, পশ্চিমদি ও খোর্দ্দঘোষপাড়া এলাকাতেও রাস্তা ও সীমানাপ্রাচীর নিয়ে জটিলতা রয়েছে।
এ ছাড়া পূর্বাচল এলাকায় কবরস্থানসংক্রান্ত সমস্যার কারণেও কাজ বিলম্বিত হয়েছে।
২০১৭ সালে তিন বছরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। মূল মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রথম দফায় সময় বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। পরে দ্বিতীয় সংশোধনীতে মেয়াদ আরও বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ মূল মেয়াদের তুলনায় প্রকল্পের সময় বেড়েছে ৮৪ মাস।
ব্যয়ের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। প্রথমে ৬৭৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও প্রথম সংশোধনীতে তা বেড়ে হয় ৭৫০ কোটি ৪০ লাখ ১০ হাজার টাকা। সর্বশেষ সংশোধনে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৮০৩ কোটি ৭৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন জানান, মূল ডিপিপি ২০১৪ সালের রেট শিডিউলের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নির্মাণকাজ শুরু হতে হতে নতুন রেট শিডিউল কার্যকর হওয়ায় ব্যয় বেড়েছে। এর সঙ্গে ভবন নির্মাণের বড় আকার, সড়ক, সীমানাপ্রাচীর, জিমনেশিয়াম, সাবস্টেশনসহ বিভিন্ন কাজ এবং সংশোধিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের কারণে নির্মাণ ব্যয়ও বেড়েছে।
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পের জন্য ৫২৮ কোটি ৩১ লাখ ৩১ হাজার টাকা ছাড় হয়েছে। এর মধ্যে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৪৪৩ কোটি ৮৬ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।
শুধু ভবন নির্মাণেই প্রকল্পের কাজ আটকে নেই। বিদ্যালয়গুলো চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াও এখনো শেষ হয়নি।
ডিপিপি অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষসহ বিভিন্ন পদে মোট ২১০টি পদ সৃষ্টির কথা রয়েছে। তবে সেই প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। তিনটি বিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষা ক্যাডারের জনবল সৃষ্টির উদ্যোগে ২০২৫ সালের আগস্টে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
ফলে ভবন নির্মাণ শেষ হলেও শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ, আসবাবপত্র, ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম, কম্পিউটার, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক উপকরণ এবং বই সরবরাহের কাজ শেষ না হলে প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে চালু করা সম্ভব হবে না।
প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন বলেন, জমি নির্বাচন ও অধিগ্রহণের সময় কোভিড-১৯ মহামারির কারণে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করেও কাজ এগিয়ে নিতে হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনটি সাইটে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা ছিল। একটি জায়গা তিনবার পরিবর্তন করতে হয়েছে, আরেকটি জায়গা মামলা জটিলতায় আটকে ছিল। পূর্বাচলের সাইটেও কবরস্থানসংক্রান্ত সমস্যা ছিল। এসব বিষয়ে গৃহায়ণ, গণপূর্ত ও রাজউকের মতো একাধিক প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা থাকায় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
তিনি জানান, তিনটি সাইটের জন্য ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়েছে। চারটি সাইট দ্রুত হস্তান্তরের উপযোগী করার চেষ্টা চলছে। বাকি কয়েকটি ভবনের কাঠামোগত কাজও এগিয়ে রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতৃত্বের ঘাটতির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ২০১৭ সাল থেকে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পে তিনজন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব অতিরিক্ত হিসেবে পালন করছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন।
পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পটি এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এ সময়ে সার্বক্ষণিক একজন প্রকল্প পরিচালক থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তদারকি ও সমন্বয় আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হবে।
আইএমইডির সমীক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো প্রকল্প গ্রহণের আগে ফিজিবিলিটি স্টাডি না করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বড় অবকাঠামো প্রকল্প নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকায় আসলে কতটি স্কুল প্রয়োজন, জমি পাওয়া যাবে কি না, শিক্ষার্থীর সংখ্যা কত এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে এসব যাচাই করা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. রুবাইয়া মুর্শেদ মনে করেন, শুধু নতুন স্কুল নির্মাণ করলেই শিক্ষার মান বা সুযোগ নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজনীয় শিক্ষক, শিক্ষা উপকরণ, একাডেমিক প্রস্তুতি এবং বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যাগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করতে হবে।
তার মতে, নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ না হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
রাজধানীর ওপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চাপ কমানো এবং ঢাকার আশপাশের মানুষের জন্য সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য ছিল প্রকল্পটির। কিন্তু নয় বছর পরও যখন তিনটি ভবনের কাজ শুরু হয়নি এবং বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনোটিই পুরোপুরি প্রস্তুত নয়, তখন প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
দীর্ঘ সময় ও বাড়তি অর্থ ব্যয়ের পর ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ এবং একাডেমিক কার্যক্রম চালুর জন্য আরও একাধিক ধাপ পেরোতে হবে।