- ২২ আগস্ট, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছে জাপান। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ছোট স্যাটেলাইটের থ্রাস্টার থেকে বড় আকারের রকেট সিস্টেম তৈরির দিকে এগোচ্ছে জাপানি স্টার্টআপ লেতারা। মহাকাশের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতেও নিজেদের প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে সাপ্পোরোভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি।
এই সম্প্রসারণের জন্য সম্প্রতি ২৬০ কোটি জাপানি ইয়েন বা প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের নতুন বিনিয়োগ পেয়েছে লেতারা। হেডলাইন এশিয়া, জাপান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন (JIC) ভেঞ্চার গ্রোথ ইনভেস্টমেন্ট এবং ইনকিউবেট ফান্ড যৌথভাবে এই বিনিয়োগে নেতৃত্ব দিয়েছে।
বিনিয়োগে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে রয়েছে এনার্জি প্রতিষ্ঠান NES (Networked Energy Services) করপোরেশন, টয়োটা গ্রুপের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান টয়োডা গোসেই এবং জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা JAXA-সমর্থিত ফ্রন্টিয়ার ইনোভেশনসের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত একটি বিনিয়োগ তহবিল।
লেতারার সহ-প্রধান নির্বাহী শোতা হিরাই জানান, এতদিন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মহাকাশে থ্রাস্টার প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণ করা। নতুন বিনিয়োগের ফলে এখন মহাকাশের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতের জন্য বিভিন্ন ধরনের হাইব্রিড রকেট ব্যবস্থা তৈরির দিকে নজর দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
লেতারার মূল প্রযুক্তি একটি হাইব্রিড রকেট ব্যবস্থা। এতে কঠিন জ্বালানি এবং দহনের জন্য প্রয়োজনীয় তরল অক্সিডাইজার আলাদা রাখা হয়। প্রচলিত কিছু হাইব্রিড রকেটে ব্যবহৃত তুলনামূলক ব্যয়বহুল প্যারাফিন মোমের পরিবর্তে প্লাস্টিক ও রাবারের মতো সহজলভ্য উপাদানকে কঠিন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের প্রযুক্তি তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
লেতারা জানিয়েছে, তাদের নিজস্ব উৎপাদন পদ্ধতিতে এসব উপাদান মিশিয়ে নির্দিষ্ট আকারে তৈরি ও সংকুচিত করা হয়। এর ফলে জ্বালানি নির্ভরযোগ্যভাবে জ্বলে এবং দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলক স্থিতিশীলভাবে শক্তি উৎপন্ন করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো হাইব্রিড রকেট প্রযুক্তির কয়েকটি বড় সীমাবদ্ধতা দূর করা পর্যাপ্ত থ্রাস্ট তৈরি, পারফরম্যান্স স্থিতিশীল রাখা এবং দহন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা।
বিশ্বজুড়ে মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে হাইব্রিড রকেট প্রযুক্তির সম্ভাবনাও বাড়ছে। বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী হাইব্রিড রকেট প্রপালশন বাজারের আকার ছিল প্রায় ৮৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ২০৩২ সালের মধ্যে তা ২৬০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই বাজারে প্রতিযোগিতাও কম নয়। জাপানের ইন্টারস্টেলার টেকনোলজিস, চীনের গ্যালাকটিক এনার্জি, দক্ষিণ কোরিয়ার ইনোস্পেস এবং সিঙ্গাপুরের ইকুয়েটোরিয়াল স্পেস হাইব্রিড রকেট প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। জার্মানির হাইইমপালস এবং অস্ট্রেলিয়ার গিলমোর স্পেসও একই প্রযুক্তির উন্নয়ন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও বিকল্প প্রপালশন ও উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে।
লেতারার যাত্রা শুরু হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার থেকে। প্রতিষ্ঠানটির দুই সহ-প্রধান নির্বাহী ল্যান্ডন থমাস ক্যাম্পস ও শোতা হিরাই সেখানে রকেট প্রপালশন নিয়ে গবেষণার সময় হাইব্রিড রকেটের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ শুরু করেন।
২০২০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা হয়ে লেতারা প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে ছোট স্যাটেলাইটের জন্য থ্রাস্টার তৈরিই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা খাতে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনাও বড় হয়েছে।
এখন লেতারা স্যাটেলাইট নির্মাতা ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, রকেট উৎক্ষেপণকারী কোম্পানি এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে সম্ভাব্য গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করছে। মহাকাশে স্যাটেলাইট পরিচালনার জন্য প্রপালশন প্রযুক্তিকে বড় বাণিজ্যিক বাজার হিসেবে দেখছে তারা। পাশাপাশি জাপান সরকারের পক্ষ থেকেও রকেট প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
লেতারার দাবি, ইতোমধ্যে রকেট ও স্যাটেলাইট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবং জাপান সরকারের কাছ থেকে তারা কিছু অর্ডার পেয়েছে। তবে এসব চুক্তির আর্থিক মূল্য প্রকাশ করা হয়নি।
বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়ার পথে লেতারার পরবর্তী বড় লক্ষ্য হলো বিদেশি একটি অংশীদারের সঙ্গে মহাকাশে থেকেই রকেট থ্রাস্টার চালানোর পরীক্ষা করা। এই পরীক্ষাকে প্রযুক্তিটির বাণিজ্যিকীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
এর পাশাপাশি বড় পরিসরে উৎপাদনের জন্য নির্ভরযোগ্য উৎপাদন ব্যবস্থা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি ও রকেটের ট্যাংকের স্থিতিশীল সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলাও লেতারার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
ভবিষ্যতে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিককে রকেটের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব কি না এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের প্রযুক্তিতে সেটি সম্ভব হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বাস্তব প্রয়োগের আগে এ বিষয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রয়োজন।
জাপান যখন নিজস্ব মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা থেকে উঠে আসা লেতারার মতো স্টার্টআপের বড় রকেট প্রযুক্তিতে প্রবেশ দেশটির সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষারই একটি প্রতিফলন।