- ২৪ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
অধিকৃত পশ্চিম তীরে এক হাজার ২০০টির বেশি আবাসিক ইউনিট নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে ইসরায়েল। দেশটির সাধারণ নির্বাচনের মাত্র দুই মাস আগে বিতর্কিত E1 বসতি প্রকল্প বাস্তবায়নে এই পদক্ষেপ নেওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
E1 নামে পরিচিত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের সঙ্গে পশ্চিম তীরের মালে আদুমিমসহ আশপাশের ইসরায়েলি বসতিগুলোর সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে। এতে পশ্চিম তীর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সমালোচকদের পাশাপাশি প্রকল্পটির সমর্থকদের একটি অংশও মনে করেন, E1 নির্মাণ হলে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আরও সংকুচিত হবে।
গত সপ্তাহে ইসরায়েল সরকার প্রকল্পটির আওতায় এক হাজার ২০০টির বেশি ইউনিট নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এর তীব্র সমালোচনা করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, E1 প্রকল্প ঘিরে আন্তর্জাতিক ক্ষোভ ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনীতিকদের জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুসহ ডানপন্থী রাজনীতিকরা দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক সমালোচনাকে ইসরায়েল বনাম বাইরের বিশ্বের দ্বন্দ্ব হিসেবে তুলে ধরে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করে আসছেন।
বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমালোচনাকে ইসরায়েলের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড E1 প্রকল্পকে ‘অগ্রহণযোগ্য ও ধ্বংসাত্মক’ বলার পর ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার তার বক্তব্যের সমালোচনা করেন।
নির্বাচন সামনে রেখে E1 প্রকল্পের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনীতিকদের জন্য ভোটারদের কাছে শক্ত অবস্থানের বার্তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান সমর্থক অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ। তার দল রিলিজিয়াস জিওনিজম পার্টি বর্তমানে নির্বাচনী সীমা পার করতে পারবে কি না, তা নিয়েই অনিশ্চয়তায় রয়েছে। ফলে বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে কঠোর অবস্থান দলটির সমর্থন বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গের মতে, নির্বাচনের এত কাছাকাছি সময়ে E1 প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়ে যাওয়া—দুটির কোনোটিই আকস্মিক নয়। তার মতে, এসব ঘটনা থেকে স্মোটরিচ ও নেতানিয়াহু উভয়েই রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন।
E1 প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া প্রায় সর্বব্যাপী। শুক্রবার মিসর, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথভাবে প্রকল্পটি বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এর আগে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালিসহ ১৫টি ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকান দেশের নেতারা E1 বসতি পরিকল্পনার সমালোচনা করেন। তাদের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, এই প্রকল্প পশ্চিম তীরকে বিভক্ত করে দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করবে।
তবে সমালোচনার পাশাপাশি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি E1 প্রকল্পের সমালোচনা না করলেও পশ্চিম তীর ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত বা অধিগ্রহণের বিরোধিতা করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে স্থিতিশীলতা ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শান্তির লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
E1 প্রকল্পের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, এটি পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক ধারাবাহিকতা ভেঙে দিতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন ও কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ভূখণ্ডগত সংযোগ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
২০২৫ সালে E1 প্রকল্পের পরিকল্পনা ঘোষণা করার সময় স্মোটরিচ বলেছিলেন, এর মাধ্যমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাকে সমাধিস্থ করা হবে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন বসতি নির্মাণ দুই-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনা কমিয়ে দিলেও এটিকে একেবারে অসম্ভব করে দিয়েছে—এমনটা এখনই বলা যায় না।
তাদের মতে, রাজনৈতিক সমঝোতা হলে ভবিষ্যতে অবৈধ বসতিগুলো অপসারণের সুযোগও থাকতে পারে।
E1 প্রকল্প ঘিরে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ রয়েছে ওই এলাকার ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে নিয়ে। পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের পাশাপাশি সড়ক নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে ইতোমধ্যে বহু ফিলিস্তিনি বাড়িঘর হারিয়েছেন এবং মৌলিক সেবার ওপরও নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়েছেন।
চলতি বছরের এপ্রিলে আজ-জাঈম বেদুইন সম্প্রদায়ের ২৩ জন ফিলিস্তিনি, যাদের মধ্যে ১৫ জন শিশু, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বাড়িঘর ভাঙার পর বাস্তুচ্যুত হন।
জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সম্প্রসারণের ফলে অঞ্চলটি আরও খণ্ডিত হওয়ার পাশাপাশি কয়েক দশক ধরে সেখানে বসবাসকারী অন্তত ১৮টি ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ফলে নির্বাচনের আগে E1 প্রকল্প শুধু ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ইস্যু নয়, বরং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, পশ্চিম তীরের ভবিষ্যৎ এবং মধ্যপ্রাচ্যে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে ঘিরে নতুন করে বড় কূটনৈতিক সংকটের কারণ হয়ে উঠেছে।