Monday, August 31, 2026

নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা, মৃত বেড়ে ৭৩৪, নিখোঁজ ৩ হাজারের বেশি


ছবিঃ ত্রিশুলিতে আকস্মিক বন্যার পর নেপালের বাসিন্দারা ক্ষয়ক্ষতির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন (সংগৃহীত । আল জাজিরা /এজরা আকায়ান/গেটি ইমেজেস)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN

নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৭৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে। বুধবারের আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর এখনো তিন হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে নেপালের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ৯০০ জনেরও বেশি শ্রমিক রয়েছেন।

হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলে একটি হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক পানির প্রবাহ থেকেই এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রবল স্রোতে নেপালের ত্রিশূলী ও ভোতেকোশী নদী অববাহিকার বিভিন্ন গ্রাম ও জনপদ প্লাবিত হয়। একই সঙ্গে ব্যাপক ভূমিধসে বহু সড়ক, সেতু ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন্যার পানির সঙ্গে ভেসে আসা মরদেহ প্রতিবেশী ভারতেও পৌঁছেছে। মৃতদেহ শনাক্ত ও সংরক্ষণ করতে গিয়ে নেপালের হাসপাতাল ও মর্গগুলোও চাপের মুখে পড়েছে।

নেপালের ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল পর্যন্ত রাশুয়া ও নুওয়াকোট জেলার ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও টানেল এলাকায় প্রায় ৯৩৩ জন শ্রমিক নিখোঁজ বা নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন।

নিখোঁজদের মধ্যে নেপালের পাশাপাশি ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের নাগরিকও রয়েছেন। কোন প্রকল্পে ঠিক কতজন আটকা পড়েছেন, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, একটি টানেলের ভেতরে শ্রমিকরা আটকা পড়ার খবর পাওয়ার পর সেখানে উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ধসে পড়া মাটি ও পাথর সরিয়ে টানেলের প্রবেশপথ পরিষ্কারের চেষ্টা চলছে।

এ কাজে নেপালি সেনাবাহিনীর ৬২ সদস্য এবং সশস্ত্র পুলিশ ও নেপাল পুলিশের ২০ সদস্যসহ মোট ৮২ জনের একটি যৌথ দল কাজ করছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেপালের পররাষ্ট্রসচিব অমৃত বাহাদুর রাই জানিয়েছেন, দেশজুড়ে উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযানে প্রায় ১৯ হাজার নিরাপত্তাকর্মী এবং ১৬টি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে।

২১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে আটকা পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী কাজ করছে। সেখানে এখন পর্যন্ত ২৫৪ জন শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে।

তবে রাশুয়ার ২২ মেগাওয়াট চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পরিস্থিতি আরও জটিল। প্রকল্পটির একটি টানেল কাদামাটি ও ধ্বংসাবশেষে পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছে না। সেখানে বিশেষজ্ঞ রক-ক্লাইম্বিং উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

নিখোঁজ শ্রমিকদের উদ্ধারে ভারতও সহায়তা শুরু করেছে। দেশটির গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসক ও টানেল উদ্ধার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ১১ সদস্যের একটি দল শনিবার নেপালে পৌঁছেছে। দলটি চিলিমে ও লাংটাং অঞ্চলে আকাশপথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

বন্যার ধ্বংসাবশেষ জমে একটি নতুন জলাধার তৈরি হওয়ায় শুক্রবার সেখানে পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়তে থাকে। এতে আরও একটি আকস্মিক বন্যার আশঙ্কায় কিছু সময়ের জন্য উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখা হয়। পরে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মনে হওয়ায় আবার তল্লাশি শুরু করা হয়।

চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সীমান্তের কাছে গিরং বন্দরের প্রায় এক কিলোমিটার উজানে তৈরি হওয়া এই জলাধারটি স্যাটেলাইট, রাডার ও ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে নিচের দিকে থাকা উদ্ধারকারী দলগুলোকে দ্রুত সতর্ক করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এদিকে রোববার নতুন করে বৃষ্টি হওয়ায় ত্রিশূলী নদীর পানিও বেড়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীদের নিরাপদ উঁচু এলাকায় সরে যেতে হয়েছে।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যায় মৃতের সংখ্যা ৭৩৪ জনে পৌঁছেছে। বিভিন্ন নদীর স্রোতে মরদেহ অনেক দূর পর্যন্ত ভেসে যাওয়ায় সেগুলো সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেপালের বিভিন্ন জেলার ২১টি হাসপাতালে অজ্ঞাত মরদেহ সংরক্ষণ ও শনাক্তের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পর্যাপ্ত হিমায়িত সংরক্ষণাগার না থাকায় মৃতদেহ সংরক্ষণ এবং ডিএনএ পরীক্ষার ক্ষেত্রেও সংকট দেখা দিয়েছে।

তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে চীনা কর্তৃপক্ষ শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে। একই সঙ্গে চীনের তিব্বত অঞ্চলে ২৩ দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।

নেপালে রোববার সকাল পর্যন্ত নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৪৯৮। এর মধ্যে ৫৮৯ জন বিদেশি এবং তাদের সঙ্গে ভ্রমণরত ১২৭ জন নেপালি নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৫, পুলিশের ২৭ এবং সশস্ত্র পুলিশের ১৩ সদস্যও নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন।

বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের দুর্গম উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েক ডজন কিলোমিটার সড়ক এবং নদীর ওপর থাকা বহু সেতু ধ্বংস হওয়ায় দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে।

নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলের হিসাবে, ভয়াবহ এই দুর্যোগে দেশের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন নদীতে নতুন করে বন্যার সতর্কতা বহাল রয়েছে।

চীন গিরং সীমান্ত এলাকায় উদ্ধারকাজে প্রায় ২ হাজার ১০০ কর্মী মোতায়েন করেছে। দেশটি ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান বরাদ্দ দিয়েছে। দুর্গম এলাকায় সরঞ্জাম ও ত্রাণ পৌঁছাতে ভারী মালবাহী ড্রোন ও হেলিকপ্টারও ব্যবহার করা হচ্ছে।

নেপালকে সহায়তায় জাতিসংঘ, রেডক্রস, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এগিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ৩৬ লাখ ডলার করে মানবিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাজ্য প্রায় ৬৮ লাখ ডলার এবং জাতিসংঘ জরুরি তহবিল থেকে ২৫ লাখ ডলার দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২৩ লাখ ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশনও ১০ লাখ ডলারের বেশি বরাদ্দের পাশাপাশি জরুরি সহায়তার জন্য আরও ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার সংগ্রহের আবেদন জানিয়েছে।

দুর্যোগের ব্যাপকতা ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধার অভিযান এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি অব্যাহত থাকলেও নতুন করে বৃষ্টি ও নদীর পানি বৃদ্ধির আশঙ্কায় উদ্ধারকারী দলগুলোকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন