Saturday, September 5, 2026

গাজার পথে আবারও আন্তর্জাতিক ফ্রিডম ফ্লোটিলা, অক্টোবরে পৌঁছানোর লক্ষ্য


ছবিঃ ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’র কর্মীরা একটি ছোট নৌকায় চড়ে গাজার উদ্দেশ্যে রওনা হতে ‘ম্যাডলিন’ (Madleen) জাহাজে পৌঁছাচ্ছেন; এ সময় ঘাটে সমবেত জনতা সংহতি জানিয়ে উল্লাস করছে ও পতাকা ওড়াচ্ছে (সংগৃহীত । আল জাজিরা /ফ্যাব্রিজিও ভিলা/গেটি)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN

গাজায় ইসরায়েলি অবরোধের বিরুদ্ধে ফের আন্তর্জাতিক সমুদ্রযাত্রার ঘোষণা দিয়েছে ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন (এফএফসি)। জোটটির উদ্যোগে কয়েকটি জাহাজ ইতোমধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন বন্দরে যাত্রাবিরতি করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউরোপের কয়েকটি দেশ ঘুরে অক্টোবর মাসে গাজার উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে বহরটি।

এফএফসি জানিয়েছে, গাজায় খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশে বাধা এবং ইসরায়েলি অবরোধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ফেরানোই তাদের এবারের অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। গত কয়েকটি অভিযানে অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবী ও অধিকারকর্মীদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর নির্যাতনের অভিযোগ থাকলেও নতুন মিশন থেকে সরে আসেনি জোটটি।

কোয়ালিশনের দাবি, আগের অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মীদের মারধর, বারবার বৈদ্যুতিক শক দেওয়া এবং যৌন নিপীড়নের মতো গুরুতর আচরণের ঘটনাও নথিবদ্ধ হয়েছে। এসব ঝুঁকি সত্ত্বেও গাজার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে সংগঠনটি।

এফএফসির তথ্য অনুযায়ী, এবারের মিশনে দুটি জাহাজ ইতোমধ্যে যাত্রা শুরু করেছে। হানদালা-২ নামের জাহাজটি জুন ও জুলাইয়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলে যাত্রা করে নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কে অবস্থান করেছে।

অন্যদিকে কেট নামের আরেকটি জাহাজ চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল বন্দর থেকে রওনা দেয়। এরপর সেটি আয়ারল্যান্ড, জার্মানি ও ফ্রান্সের বিভিন্ন বন্দরে যায়।

আগামী পর্যায়ে স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালির বন্দরে থামার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব যাত্রাবিরতি শেষে জাহাজগুলো ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে গাজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।

এফএফসি স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য জোহার চেম্বারলেইন রেগেভ বলেন, বিভিন্ন সরকার গাজার বিষয়ে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না বলেই তারা আবার সমুদ্রযাত্রায় নেমেছেন। প্রতিটি বন্দরে তারা ফিলিস্তিনিদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানাবেন।

নতুন এই বহরে মানবাধিকারকর্মী, শান্তিকর্মী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, চিকিৎসক এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন।

ফ্লোটিলা কোয়ালিশন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বহরের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা, গাজায় খাদ্য-পানি ও ওষুধ প্রবেশে বাধা বন্ধ করতে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং জাহাজে হামলা বা তা জব্দ করা হলে এর কূটনৈতিক পরিণতি নিশ্চিত করা।

একই সঙ্গে অবরোধ প্রত্যাহারে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

মিশনে অংশ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের প্রকৌশলী এডওয়ার্ড ডিগিলিও বলেন, গাজার দিকে যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ—এটি তারা জানেন। তবে তার মতে, ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের সময় নীরব থাকা এবং কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার মূল্য আরও বেশি।

গাজায় সমুদ্রপথে পৌঁছানোর চেষ্টা নতুন নয়। ২০০৮ সালে ফ্রি গাজা মুভমেন্টের প্রথম অভিযান থেকে এ ধরনের উদ্যোগের সূত্রপাত। ২০১০ সালে মাভি মারমারা জাহাজে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানে ১০ জন অধিকারকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাও ফ্লোটিলা আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

গত এক বছরেও গাজামুখী গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা একাধিকবার ইসরায়েলি বাহিনীর বাধার মুখে পড়ে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ৪৫০ জনের বেশি অংশগ্রহণকারীকে আটক করা হয়েছিল বলে এফএফসি জানিয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক জুকিসওয়া ওয়ানার এবং নেলসন ম্যান্ডেলার নাতি মান্ডলা ম্যান্ডেলাও ছিলেন।

এরপর ২০২৬ সালের এপ্রিলে আরও প্রায় ১৭৫ জনকে আটক করা হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, আটক কয়েকজনের ক্ষেত্রে ঘুম থেকে বঞ্চিত করা, পানি ও চিকিৎসা না দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্ব্যবহারের তথ্য তারা নথিবদ্ধ করেছে।

এপ্রিলের অভিযানে আটক দুই কর্মী থিয়াগো আভিলা ও সাইফ আবুকেশেককে কয়েক দিন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগবিহীন অবস্থায় রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে তাদের ইসরায়েল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

ফ্লোটিলার নতুন উদ্যোগ এমন সময়ে সামনে এলো, যখন যুদ্ধবিরতির পরও গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ কমেনি।

ইউনিসেফের হিসাবে, গাজার ৮২ শতাংশের বেশি পরিবার এখনো নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানির সংকটে রয়েছে। একই সঙ্গে পানি ও পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামোর প্রায় ৯০ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতেও গাজার হাসপাতাল, ত্রাণের গুদাম ও চিকিৎসাসামগ্রী সংরক্ষণের স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ কিংবা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের নতুন সমুদ্রযাত্রা গাজা অবরোধ ও মানবিক সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আবারও আকর্ষণ করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে আগের অভিযানের মতো এবারও বহরটি ইসরায়েলি বাধার মুখে পড়বে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন