Saturday, September 12, 2026

বিএনপি সরকার আমলে ৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি, জাতীয়করণের তালিকায় আরও ২৮


প্রতীকী ছবিঃ শিক্ষা মন্ত্রণালয় (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ঢাকা

২০২৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয় এবং দুটি ডিগ্রি কলেজ। পাশাপাশি আরও ২৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণের প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সরকারিকরণ হওয়া তিন বিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে বান্দরবানের থানচি উপজেলার তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, বগুড়ার গাবতলী উপজেলার গাবতলী পাইলট উচ্চবিদ্যালয় এবং একই জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সরকারি মাধ্যমিক-৩ শাখা থেকে গত ১৩ জুলাই জারি করা প্রজ্ঞাপনে তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণের কথা জানানো হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ওই দিন থেকেই বিদ্যালয়টির নতুন নাম হয়েছে ‘তিন্দু সরকারি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়’।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করে বিদ্যালয়টির শিক্ষক ও কর্মচারীদের আত্তীকরণ করা হবে। আত্তীকরণের পর তাঁদের চাকরি বদলিযোগ্য হবে না।

এরপর ২৭ আগস্ট বগুড়ার দুটি বিদ্যালয় সরকারিকরণের বিষয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়কে ২৫ আগস্ট থেকে ‘শিবগঞ্জ সরকারি পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ এবং গাবতলী পাইলট উচ্চবিদ্যালয়কে ২৭ আগস্ট থেকে ‘গাবতলী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে সরকারিকরণ করা হয়েছে।

এই দুটি প্রজ্ঞাপনেও শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী আত্তীকরণের কথা বলা হয়েছে। আত্তীকরণের পর তাঁদের চাকরি বদলযোগ্য হবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারিকরণের তালিকায় থাকা দুই ডিগ্রি কলেজ হলো বগুড়ার গাবতলী উপজেলার শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ এবং পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জা গোলাম হাফিজ ডিগ্রি কলেজ।

গত ২৫ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে এ দুটি কলেজ সরকারিকরণের বিষয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন সিনিয়র সহকারী সচিব মনজুরুল আলম।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা-২০১৮’ অনুযায়ী মির্জা গোলাম হাফিজ ডিগ্রি কলেজ এবং শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজকে ২৫ আগস্ট ২০২৬ থেকে সরকারি করা হয়েছে।

পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে সরকারি হওয়ার পাশাপাশি আরও ২৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে দেশের বিভিন্ন জেলার স্কুল ও কলেজ।

তালিকায় ঠাকুরগাঁওয়ের রুহিয়া ডিগ্রি কলেজ ও ভুল্লী ডিগ্রি কলেজ, ভোলার নাজিউর রহমান কলেজ, চরফ্যাশনের ফাতেমা-মতিন মহিলা মহাবিদ্যালয়, চরফ্যাশন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, করিমুন্নেছা-হাফিজ মহিলা কলেজ এবং মনপুরার সাকুচিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে।

এ ছাড়া বগুড়ার মহাস্থান মাহীসওয়ার ডিগ্রি কলেজ ও পল্লী উন্নয়ন একাডেমি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বরিশালের শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজ ও বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কলেজকেও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও শিবগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজ, নওগাঁর কোলা আদর্শ ডিগ্রি কলেজ এবং চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ মহিলা কলেজ রয়েছে এ তালিকায়।

মাদারীপুরের সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ, নাটোরের গোপালপুর ডিগ্রি কলেজ, পটুয়াখালীর আবদুল করিম মৃধা কলেজ, সিরাজগঞ্জের হাজী ওয়াহেদ-মরিয়ম কলেজ, ফরিদপুরের নবকাম পল্লী কলেজ, মাগুরার কাজী সালিমা হক মহিলা কলেজ ও আমিনুর রহমান ডিগ্রি কলেজও জাতীয়করণের উদ্যোগের আওতায় রয়েছে।

পাবনার কাশিনাথপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ, ঈশ্বরদী মহিলা কলেজ, সেলিম রেজা হাবিব ডিগ্রি/অনার্স কলেজ ও সুজানগর নিজাম উদ্দিন আসগর আলী ডিগ্রি কলেজও তালিকায় রয়েছে। একই তালিকায় রয়েছে গাজীপুরের কালিয়াকৈর কলেজ এবং ময়মনসিংহের আব্দুর রহমান ডিগ্রি কলেজ।

জাতীয়করণের তালিকায় থাকা বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জাতীয়করণের উপযোগিতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর পাশাপাশি দেশের শতবর্ষী স্কুল-কলেজের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজও চলছে। গত ২ সেপ্টেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) দেশের শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য পাঠানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়। জাতীয়করণ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের এসব প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের বর্তমান প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। শিক্ষার মান, ফলাফল এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতায় এগিয়ে থাকা কিছু প্রতিষ্ঠান তালিকার বাইরে থাকলেও তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা কিছু প্রতিষ্ঠান কীভাবে তালিকায় স্থান পেয়েছে, তা নিয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যেসব প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ করা হয়েছে কিংবা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে, সেগুলোর বড় একটি অংশ সংশ্লিষ্ট এলাকার মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সুপারিশের ভিত্তিতে বাছাই করা হয়েছে।

এর মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় জাতীয়করণের উদ্যোগ পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর একটি বান্দরবানের থানচির তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, যা ইতোমধ্যে সরকারি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, মানবিক বিষয় বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানটি সরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরকারি করার সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও শিক্ষানীতিগত প্রভাবও জড়িত। শিক্ষার মান, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ভৌগোলিক প্রয়োজন এবং কোনো এলাকায় সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘাটতি এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জাতীয়করণ করা হলে তা শিক্ষা বিস্তারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে নির্দিষ্ট ও সবার জন্য সমান নীতিমালা ছাড়া ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রভাবশালী মহলের সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয়করণ করা হলে ভবিষ্যতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব ও তদবিরের সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। নীতিমালা থাকলে সরকারের সিদ্ধান্তের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব। তাঁর মতে, নীতিমালা না থাকার সুযোগে সরকার ইচ্ছামতো যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে সরকারি করার সুযোগ পায়।

এদিকে সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিনও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন