- ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতিতে গণিতের জটিল ও অমীমাংসিত সমস্যার সমাধানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গণিতবিদেরা। এআই গবেষণাগারগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতায় বিখ্যাত গাণিতিক সমস্যার সমাধান কে আগে দিতে পারে এ নিয়ে যে দৌড় শুরু হয়েছে, তাতে গণিতচর্চার প্রচলিত গবেষণা সংস্কৃতি ও গবেষকদের মেধাস্বত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
এ বিষয়ে ২৫ জন খ্যাতনামা গণিতবিদ একটি খোলা চিঠিতে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের প্রত্যেকেই ফিল্ডস মেডালপ্রাপ্ত গণিতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
গণিতবিদদের এই উদ্বেগ এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন এআই ব্যবহার করে কঠিন গাণিতিক সমস্যার সমাধান নিয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ত্রিস্তান বাকমাস্টার অভিযোগ করেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ গাণিতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে তাঁর এক সহযোগীকে যথাযথভাবে কৃতিত্ব না দেওয়ার জন্য ওপেনএআইয়ের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। ওই সহযোগী বর্তমানে অ্যানথ্রপিকে কর্মরত।
বাকমাস্টার আরও প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের কাজের সঙ্গে কোডেক্স ব্যবহার করে করা গবেষণা কোনোভাবে ওপেনএআইয়ের নিজস্ব গবেষণায় কাজে লেগেছে কি না। এর পরপরই প্রতিষ্ঠানটি নাভিয়ে-স্টোকস সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান প্রকাশ করে। তবে সেই প্রমাণ এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি।
এ নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই বৃহস্পতিবার ক্যালটেকের একটি গণিত আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাহার করে নেয় ওপেনএআই। বিশ্ববিদ্যালয়টির কয়েকজন গবেষকের সমালোচনার পর প্রতিষ্ঠানটি এই সিদ্ধান্ত নেয় বলে জানা গেছে।
গণিতবিদদের খোলা চিঠিতে বলা হয়েছে, এআই যদি মানবজাতির দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত গাণিতিক সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারে, সেটি নিঃসন্দেহে মানবসমাজের জন্য বড় অর্জন হতে পারে। কিন্তু কোনো এআই-উদ্ভাবিত সমাধান তখনই গণিতের জগতে স্থায়ী মূল্য পাবে, যখন অন্য গণিতবিদেরা সেটি বুঝতে, যাচাই করতে এবং ভবিষ্যৎ গবেষণায় ব্যবহার করতে পারবেন।
তাঁদের আশঙ্কা, এআইয়ের মাধ্যমে দ্রুত কোনো সমস্যার সমাধান সামনে আনার প্রতিযোগিতায় গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধাপ উপেক্ষিত হচ্ছে। নতুন পদ্ধতি ও ধারণাগুলো যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আগের গবেষণা বা গবেষকদের অবদান যথাযথভাবে উল্লেখ না করার ঝুঁকিও বাড়ছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কৃতিত্ব দাবি, মেধাস্বত্ব এবং গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তাঁরা।
গণিতবিদদের মতে, কোনো নতুন ধারণাকে শুধু একটি এআই মডেল তৈরি করলেই সেটি গণিতের জগতে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। সেই ধারণাকে যাচাই, ব্যাখ্যা, উন্নয়ন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য মানব গণিতবিদদের প্রয়োজন। এই ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে গণিতের জ্ঞান সৃষ্টির পাশাপাশি তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এআই নিয়ে গণিতবিদদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো গবেষণায় গোপনীয়তা বাড়ার সম্ভাবনা। অনেক গবেষক আশঙ্কা করছেন, তাঁরা এআইয়ের কোডিং বা গণিতভিত্তিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে যে কাজ করছেন, সেসব তথ্য ভবিষ্যতে কোনোভাবে নতুন মডেল তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে কোনো গবেষক বা গবেষক দলের আবিষ্কারের সম্ভাব্য পথ ব্যবহার করে দ্রুত নিজেদের এআই সিস্টেমের মাধ্যমে একই সমস্যার সমাধান বের করার চেষ্টা করতে পারে। এমন প্রতিযোগিতা চলতে থাকলে গবেষকেরা নিজেদের কাজ প্রকাশে আরও সতর্ক হয়ে উঠতে পারেন।
এর ফলে গণিতের গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা উন্মুক্ত তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতার সংস্কৃতি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এআইয়ের কারণে গণিতচর্চায় সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে এর আগেও আলোচনা হয়েছে। চলতি বছরের জুনে গণিতবিদদের একটি কর্মী দল ‘লেইডেন ডিক্লারেশন’ প্রকাশ করে। সেখানে গাণিতিক গবেষণায় বড় ভাষা মডেল বা এলএলএমের ব্যবহার কীভাবে গবেষণার পদ্ধতি বদলে দিতে পারে, সেই সঙ্গে গণিতবিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের জন্য বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
গণিতের এই বিতর্ককে অনেকেই এআইয়ের কারণে সফটওয়্যার প্রকৌশলসহ অন্যান্য সৃজনশীল ও জ্ঞানভিত্তিক পেশায় তৈরি হওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করছেন। কারণ এসব ক্ষেত্রে এআই কেবল কাজের গতি বাড়াচ্ছে না, বরং কাজের ধরন, কৃতিত্বের ধারণা এবং মানুষের ভূমিকা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
গণিতবিদদের ভাষ্য, একটি গাণিতিক প্রমাণই গণিতের সম্পূর্ণ মূল্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নতুন প্রশ্ন তৈরি, নতুন ধারণার বিকাশ, শিক্ষার্থীদের শেখানো এবং একটি আবিষ্কারকে বৃহত্তর জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে যুক্ত করার দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
তাই এআইয়ের সক্ষমতা যতই বাড়ুক, গণিতসহ বিজ্ঞান ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা এবং গবেষণার মৌলিক উদ্দেশ্য যেন হারিয়ে না যায় এটাই তাঁদের মূল উদ্বেগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিতর্ক কেবল গণিতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম। এআই যেভাবে একের পর এক পেশা ও গবেষণাক্ষেত্রে প্রবেশ করছে, তাতে ভবিষ্যতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সাহিত্য ও অন্যান্য সৃজনশীল পেশাতেও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে—এআইয়ের মাধ্যমে কাজ দ্রুত সম্পন্ন হলেও সেই কাজের উদ্দেশ্য, কৃতিত্ব ও মানবিক মূল্য কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে।