- ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
স্টাফ রিপোর্ট: PNN
সিডনি সুইনিকে ঘিরে আলোচনা যেন কখনো থামে না। পর্দায় সাহসী দৃশ্য, বিজ্ঞাপনে ভিন্নধর্মী উপস্থিতি কিংবা ব্যক্তিগত জীবন বিভিন্ন কারণেই নিয়মিত খবরের শিরোনাম হন এই মার্কিন অভিনেত্রী। তবে বিতর্কের বাইরেও তাঁর ক্যারিয়ার বলছে অন্য গল্প। একের পর এক আলোচিত চরিত্র, চলচ্চিত্রে সাফল্য এবং প্রযোজনায় যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে হলিউডে নিজের অবস্থান ক্রমেই শক্ত করছেন তিনি।
আজ ১২ সেপ্টেম্বর সিডনি সুইনির জন্মদিন। ১৯৯৭ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের স্পোকেনে জন্ম নেওয়া অভিনেত্রীর শৈশব কেটেছে গ্রামীণ পরিবেশে। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনাতেও আগ্রহী ছিলেন তিনি। ফুটবল, সফটবল, স্কি, ওয়েকবোর্ডিংয়ের মতো খেলায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তায়কোয়ান্দো, জুজিৎসু ও কিকবক্সিংয়েও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
অভিনয়ের প্রতি আগ্রহও তৈরি হয় খুব অল্প বয়সে। পরিবারের সদস্যদের সামনে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতেন তিনি। কিন্তু অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার ইচ্ছাকে শুরুতে খুব একটা গুরুত্ব দেননি তাঁর বাবা-মা।
পরিস্থিতি বদলে যায় স্থানীয়ভাবে একটি চলচ্চিত্রের শুটিং শুরু হলে। তখন অডিশন দেওয়ার অনুমতি পেতে বাবা-মাকে বোঝাতে সিডনি একটি পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপনা তৈরি করেছিলেন। সেখানে অভিনয়জীবন নিয়ে পাঁচ বছরের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর সেই আগ্রহ শেষ পর্যন্ত পরিবারকে রাজি করায়।
এরপর মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে লস অ্যাঞ্জেলেসে পাড়ি জমান সিডনি। কিন্তু স্বপ্নের শহরে পৌঁছেই সাফল্য আসেনি। বরং দীর্ঘ সময় ধরে একের পর এক অডিশন, প্রত্যাখ্যান এবং ছোট চরিত্রে কাজ করতে হয়েছে তাঁকে।
‘প্রিটি লিটল লায়ার্স’, ‘গ্রেস অ্যানাটমি’, ‘ক্রিমিনাল মাইন্ডস’ ও ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’-এর মতো জনপ্রিয় সিরিজে অভিনয় করলেও বড় পরিচিতি পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে কয়েক বছর। সিডনির ভাষ্য অনুযায়ী, শৈশবে তৈরি করা পাঁচ বছরের পরিকল্পনা বাস্তবে পূরণ হতে সময় লেগেছিল প্রায় এক দশক।
এই দীর্ঘ পথচলায় পরিবারকেও আর্থিক চাপ সামলাতে হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেসে থাকা ও অভিনয়ের পেছনে ব্যয় করতে গিয়ে একসময় তাঁর পরিবার কঠিন আর্থিক সংকটে পড়ে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ এবং পরিবারের দেউলিয়াত্বের আবেদন সব মিলিয়ে সময়টি ছিল কঠিন। তবে সেই অভিজ্ঞতা সিডনিকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
২০১৮ সালে ‘এভরিথিং সাক্স!’ ও ‘শার্প অবজেক্টস’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের নজরে আসেন সিডনি। এরপর ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’-এ কাজ করে পরিচিতি বাড়ে। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাঁক আসে এইচবিওর আলোচিত সিরিজ ‘ইউফোরিয়া’ দিয়ে।
সিরিজটিতে ক্যাসি হাওয়ার্ড চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা পান তিনি। আবেগ, সম্পর্ক, আত্মপরিচয় ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা একটি জটিল চরিত্রকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন সিডনি। এরপর তাঁকে আর শুধু উদীয়মান অভিনেত্রী হিসেবে দেখার সুযোগ ছিল না।
‘দ্য হোয়াইট লোটাস’-এ অলিভিয়া মোসবাখার চরিত্রও তাঁর ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এই দুটি সিরিজের জন্যই এমি মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি। ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’-এর জন্য ২০২২ সালে সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে এমি মনোনয়ন তাঁর অভিনয়ক্ষমতার বড় স্বীকৃতি হয়ে আসে।
সিডনিকে নিয়ে দর্শকের একটি অংশের ধারণা ছিল, গ্ল্যামারনির্ভর চরিত্রেই হয়তো তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ। কিন্তু ‘রিয়েলিটি’ সিনেমায় সেই ধারণাকে অনেকটাই পাল্টে দেন অভিনেত্রী। বাস্তব চরিত্র রিয়েলিটি উইনারকে কেন্দ্র করে নির্মিত সিনেমাটিতে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়।
এরপর পেশাদার বক্সার ক্রিস্টি মার্টিনের জীবনভিত্তিক সিনেমা ‘ক্রিস্টি’র জন্যও কঠোর প্রস্তুতি নেন তিনি। চরিত্রটির জন্য বক্সিং প্রশিক্ষণের পাশাপাশি শারীরিক গঠনেও বড় পরিবর্তন আনেন। এর মাধ্যমে শুধু তারকা-ইমেজ নয়, একজন অভিনেত্রী হিসেবে নিজের সক্ষমতাও সামনে আনতে চেয়েছেন সিডনি।
টেলিভিশনের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন তিনি। ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম...ইন হলিউড’ থেকে ‘ম্যাডাম ওয়েব’ বিভিন্ন ধরনের সিনেমায় কাজ করেছেন সিডনি। তবে ২০২৩ সালের রোমান্টিক কমেডি ‘অ্যানিবডি বাট ইউ’ তাঁর চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আনে।
গ্লেন পাওয়েলের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করা সিনেমাটি বক্স অফিসে সাফল্য পাওয়ায় আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে আরও পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। একই সঙ্গে অভিনয়ের বাইরেও নিজের সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা শুরু করেন।
নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ফিফটি-ফিফটি ফিল্মসের মাধ্যমে ‘অ্যানিবডি বাট ইউ’ ও ‘ইম্যাকুলেট’-এর মতো প্রকল্পে প্রযোজকের দায়িত্ব পালন করেছেন সিডনি। অর্থাৎ ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের পাশাপাশি ক্যামেরার পেছনের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও নিজের ভূমিকা বাড়াচ্ছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ডের জগতেও তাঁর উপস্থিতি কম নয়। আরমানি বিউটি, মিউ মিউ, লেনিজ, ফোর্ড, স্যামসাং ও আমেরিকান ইগলের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। বিশেষ করে ২০২৫ সালের আমেরিকান ইগলের ‘সিডনি সুইনি হ্যাজ গ্রেট জিন্স’ প্রচারণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
‘ইউফোরিয়া’সহ বিভিন্ন কাজে সাহসী দৃশ্যে অভিনয়ের কারণে সিডনি সুইনি নিয়মিত আলোচনায় এসেছেন। এ নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। তবে চরিত্রের প্রয়োজনে এ ধরনের দৃশ্যে অভিনয় করা থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা নেই বলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যের মূল সুর একজন অভিনেত্রীর কাজ বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করা। তাই পর্দার একটি নির্দিষ্ট দৃশ্য দিয়ে তাঁর অভিনয়কে মূল্যায়ন না করে পুরো কাজটি দেখার আহ্বানই বরাবরই উঠে এসেছে তাঁর কথায়।
অভিনয়, প্রযোজনা ও ব্যবসা তিন ক্ষেত্রেই নিজের পরিধি বাড়াচ্ছেন সিডনি। সামনে তাঁর হাতে রয়েছে বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প।
এর মধ্যে রয়েছে জনপ্রিয় জাপানি মেচা ফ্র্যাঞ্চাইজির হলিউড সংস্করণ ‘গানডাম’। এতে নোয়াহ সেন্টিনিওর সঙ্গে অভিনয় করছেন তিনি। পাশাপাশি ‘দ্য হাউসমেইডস সিক্রেট’-এ মিলি ক্যালোওয়ের চরিত্রে ফেরার কথা রয়েছে তাঁর। ছবিটিতে কার্স্টেন ডানস্টও অভিনয় করছেন।
এডিথ ওয়ার্টনের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘দ্য কাস্টম অব দ্য কান্ট্রি’তেও কেন্দ্রীয় চরিত্রে দেখা যাবে তাঁকে। ছবিটির প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত আছেন সিডনি।
এ ছাড়া ‘স্ক্যান্ডালাস!’ ছবিতে কিংবদন্তি অভিনেত্রী কিম নোভাকের চরিত্রে অভিনয় করবেন তিনি। ফলে আগামী সময়েও পর্দায় ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে সিডনির উপস্থিতি থাকছে।
একসময় যিনি ছোট শহর থেকে হলিউডে এসে অডিশনের পর অডিশন দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, তিনিই এখন অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা ও ব্যবসায়ও নিজের অবস্থান তৈরি করছেন। বিতর্ক তাঁর ক্যারিয়ারের সঙ্গী হলেও সিডনি সুইনির পথচলার আরেকটি দিক হলো প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে নিজেকে আরও বড় পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা। জন্মদিনে তাই তাঁর ক্যারিয়ারকে শুধু আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে নয়, দীর্ঘ সংগ্রাম থেকে উঠে আসা এক তরুণ অভিনেত্রীর গল্প হিসেবেও দেখা যায়।