- ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও উৎপাদন অবকাঠামোয় হামলা চালানোর দাবি করেছে রাশিয়া। মস্কোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের একাধিক শিল্প স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। একই সময়ে রাশিয়ার বিভিন্ন শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার খবরও পাওয়া গেছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, শনিবার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া শহরের বড় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জাপোরিঝস্তালে হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। একই অভিযানে মধ্যাঞ্চলের নিপ্রো শহরের ইন্টারপাইপ স্টিল কমপ্লেক্স এবং দক্ষিণাঞ্চলের ক্রিভি রিহ শহরের কয়েকটি শিল্পকারখানাও লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
ক্রিভি রিহ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নিজ শহর হিসেবেও পরিচিত।
রুশ সংবাদ সংস্থা ইন্টারফ্যাক্সের বরাতে জানা গেছে, রাতের হামলায় কৃষ্ণসাগরের বন্দরনগরী চোরনোমোরস্কে দুটি পণ্যবাহী জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে রাশিয়া দাবি করেছে।
রাশিয়ার হামলার দাবির পাশাপাশি ইউক্রেনও রুশ ভূখণ্ডের শিল্প স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, রাশিয়ার সামারা অঞ্চলের শিল্প স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা চালানো হয়। ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফের দাবি, হামলায় তোলিয়াত্তিকাউচুক নামের একটি কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম রাবার ও জ্বালানি সংযোজক উৎপাদন করে, যার কিছু উপাদান রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানিতে ব্যবহৃত হয় বলে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সামারা অঞ্চলের তোলিয়াত্তি শহরের মেয়র ইলিয়া সুখিখ জানান, ড্রোন হামলায় কয়েকটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে একজন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, রাতভর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের আকাশে ২৩০টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এসব ড্রোন এক ডজনেরও বেশি রুশ অঞ্চলের পাশাপাশি ক্রিমিয়া, আজভ সাগর ও কৃষ্ণসাগর এলাকায় শনাক্ত করা হয়েছিল বলে মস্কোর দাবি।
রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলের তাগানরগ শহরে পৃথক হামলায় চারটি বাণিজ্যিক স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে স্থানীয় মেয়র স্বেতলানা কামবুলোভার বরাত দিয়ে রুশ সংবাদ সংস্থা তাস জানিয়েছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে রাশিয়া দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্রতিরক্ষা শিল্প, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্থাপনায় ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে আসছে। মস্কোর সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবে ইউক্রেনের অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা ব্যাহত করাই এসব হামলার অন্যতম লক্ষ্য বলে রুশ পক্ষ দাবি করে।
অন্যদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে তেল শোধনাগার ও অন্যান্য জ্বালানি অবকাঠামো হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। এসব হামলার ফলে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক সক্ষমতায় চাপ তৈরির চেষ্টা করছে কিয়েভ।
ফলে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলার পরিধি সামরিক স্থাপনার বাইরেও শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামো পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।
শিল্প স্থাপনায় হামলার পাশাপাশি ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন এলাকায় রুশ হামলায় হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।
শুক্রবার কিয়েভের দুটি পেট্রল স্টেশনে রুশ হামলায় অন্তত দুজন নিহত হন। এর আগের দিনও রাজধানীর কয়েকটি জ্বালানি স্টেশন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। এতে কিয়েভের বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে রাশিয়া নতুন ধরনের হামলা চালাচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইউক্রেনের আঞ্চলিক গভর্নরদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নিপ্রোপেত্রোভস্ক ও জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খারকিভে রুশ হামলায় আরও তিনজন নিহত হয়েছেন।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো জানিয়েছেন, রাজধানীতে হামলায় ১২ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১২ বছর বয়সী একটি শিশুও রয়েছে। রাজধানীসংলগ্ন কিয়েভ অঞ্চলেও একজন নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছেন স্থানীয় গভর্নর।
এ ছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বন্দরনগরী ওদেসায় রাতের রুশ হামলায় অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সেখানকার সামরিক প্রশাসনের প্রধান সেরহি লাইসাক।
ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় হতাহতের খবরও এসেছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় একজন নিহত হয়েছেন।
ইউক্রেন সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ অঞ্চলেও ড্রোন হামলায় একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। রুশ নিয়ন্ত্রিত পূর্ব দোনেৎস্ক অঞ্চলের প্রশাসনের প্রধানের দাবি, ড্রোন হামলায় স্থানীয় একটি গ্যাস কোম্পানির দুই কর্মী নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া ভলগোগ্রাদে ইউক্রেনীয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একজন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ওই হামলায় একটি শিল্প স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যদিও সেটির নাম প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে যুদ্ধ চললেও সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়ে নতুন ইঙ্গিত দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম ডয়চে ভেলের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অনুষ্ঠেয় জি-২০ সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বসতে তিনি প্রস্তুত তবে দুজনকেই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হলে।
তবে আলোচনার সম্ভাবনার এই ইঙ্গিতের পাশাপাশি উভয় পক্ষের হামলা অব্যাহত থাকায় ইউক্রেন যুদ্ধের সামরিক উত্তেজনা এখনো কমেনি। বরং শিল্প, জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি হামলা সংঘাতের নতুন মাত্রা তৈরি করছে।