Saturday, September 26, 2026

তেলনির্ভর ইরাকে যুদ্ধের বড় ধাক্কা, কমেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ


ফাইল ছবিঃ ১৭ মার্চ, ২০২৬ তারিখে ইরাকের ইরবিলে জ্বালানি তেল ও গাড়ির জ্বালানি বিক্রির একটি বাজারে ট্যাঙ্কার ট্রাকের পাশে কয়েকজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছেন। (সংগৃহীত । আল জাজিরা /সেদাত সুনা/গেটি ইমেজেস)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

ইরানের যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্নের প্রভাব পড়েছে ইরাকের অর্থনীতিতে। তেল রপ্তানিনির্ভর দেশটিতে একদিকে কমেছে বৈদেশিক আয়, অন্যদিকে বাধাগ্রস্ত হয়েছে আমদানি। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শিল্পের কাঁচামাল সবকিছুর সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়েছে ইরাকি দিনার এবং বেড়েছে আমদানি করা পণ্যের দাম।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি চলতি সপ্তাহে বলেছেন, দেশটি বর্তমানে ‘অসাধারণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের’ মুখোমুখি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ইরাক প্রায় ৬ হাজার কোটি ডলারের তেল রাজস্ব হারিয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে উপসাগরীয় রুট ব্যবহার করে যে পরিমাণ তেল রপ্তানি করা হতো, যুদ্ধের একটি পর্যায়ে তার প্রায় ৯০ শতাংশই রপ্তানি করা সম্ভব হয়নি।

ইরাকের অর্থনীতিতে এর প্রভাব বড় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো দেশটির বাজেটের ৯০ শতাংশেরও বেশি তেল রাজস্বের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তেল রপ্তানিতে বাধা তৈরি হওয়ায় সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়ছে।

যুদ্ধের কারণে শুধু তেল রপ্তানিই নয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহনেও বিঘ্ন ঘটেছে। বিকল্প দীর্ঘ নৌপথ ব্যবহার করতে গিয়ে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইরাকের ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। একই সঙ্গে কমেছে বিদেশ থেকে আসা পণ্যের সরবরাহ।

বাগদাদের এক সুপারমার্কেট মালিক আলা-এদ্দিন সুলাইবি আল জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধের আগে তার দোকানে বিক্রি হওয়া পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই ছিল আমদানিনির্ভর। বর্তমানে সেই হার কমে প্রায় ৭০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

তার ভাষ্য, বাধ্য হয়েই স্থানীয় পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে, যদিও এসব পণ্যের মান অনেক ক্ষেত্রে আমদানিকৃত পণ্যের সমপর্যায়ের নয়। এদিকে আমদানি করা পণ্যের দামও বেড়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ।

সুলাইবি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে পরিবহনব্যবস্থার সংকটের পাশাপাশি চীন থেকে পণ্য আসতে বেশি সময় লাগছে। তুরস্কের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। ফলে সার্বিকভাবে আমদানির খরচ বাড়ছে।

ইরাকি কয়েকজন ব্যবসায়ী আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, চীন থেকে আসা কিছু পণ্য এখন গন্তব্যে পৌঁছাতে তিন মাস পর্যন্ত সময় নিচ্ছে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে জাহাজগুলোকে ঘুরপথে চলাচল করতে হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের জটের কারণে পণ্য আটকে থাকছে।

অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়েছে ইরাকি মুদ্রা দিনারের ওপরও। যুদ্ধের আগে সমান্তরাল বাজারে এক ডলারের দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৪০ দিনার। গত সপ্তাহে তা বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ দিনারে উঠেছিল। চলতি সপ্তাহে কিছুটা কমে তা প্রায় ১ হাজার ৫৭৫ দিনারে নেমেছে।

অন্যদিকে সরকারি বিনিময় হার প্রায় ১ হাজার ৩০০ দিনার প্রতি ডলার। সরকারি ও সমান্তরাল বাজারের এই বড় ব্যবধান ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে এবং ভোক্তাদের ওপরও বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।

সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি দরে ডলার পাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই সহজ নয়। ফলে কিছু ব্যবসায়ী তুলনামূলক কম দামে সরকারি বাজার থেকে ডলার পেলেও অন্যদের বেশি দামে সমান্তরাল বাজার থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে। এতে আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।

ইরাক সরকার একই সময়ে তেল বিক্রির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা দেশটির ডলার আয়ের অর্থ কীভাবে ও কতটা দেশে স্থানান্তর করা হচ্ছে, তা নিয়েও চাপের মধ্যে রয়েছে।

২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেন সরকারের পতনের পর ইরাকের তেল রাজস্ব যুক্তরাষ্ট্রে একটি বিশেষ হিসাবে রাখা হয়। সেখান থেকে ইরাকে অর্থ স্থানান্তর করা হয়। এই ব্যবস্থার মেয়াদ প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের মাধ্যমে নবায়ন করা হয়। এর ফলে ইরাকের আর্থিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ওয়াশিংটনেরও উল্লেখযোগ্য তদারকি রয়েছে।

চলতি বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসন ওই হিসাব থেকে ইরাকে নগদ ডলার পাঠানো বন্ধ করে দেয় এবং মূলত ইলেকট্রনিকভাবে অর্থ স্থানান্তরের অনুমতি দেয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই যুক্তরাষ্ট্র এমন পদক্ষেপ নিয়েছিল।

জুলাইয়ে কিছু নগদ ডলার পাঠানো আবার শুরু হলেও ইরাকের কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ইরানে বড় পরিসরে ডলার পাচারের অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র।

স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আমদানি অর্থায়নের জন্য পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ করতে সমস্যায় পড়ছে। এর ফলে স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তবে ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরনের ডলার সংকটের কথা অস্বীকার করেছে। শনিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে ব্যাংকটি জানিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা পূরণের মতো পর্যাপ্ত রিজার্ভ তাদের রয়েছে এবং এর মধ্যে বৈদেশিক বাণিজ্যে অর্থায়নের প্রয়োজনও অন্তর্ভুক্ত।

সমান্তরাল বাজারে ডলারের দাম বাড়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘জল্পনা, প্রত্যাশা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির অপব্যবহার’-কে দায়ী করেছে। তাদের মতে, কিছু পক্ষ ইরাকের অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগাচ্ছে।

যুদ্ধের প্রভাবে ইরাকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমেছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক উপদেষ্টা মুধের মোহাম্মদ সালেহ চলতি সপ্তাহে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ১০ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। আগস্টের শেষ নাগাদ তা কমে প্রায় ৮ হাজার কোটি ডলারে নেমে এসেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, চলমান সংকট ইরাকের অর্থনীতির দীর্ঘদিনের কিছু কাঠামোগত দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বিশেষ করে তেল আয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং আমদানিনির্ভর ভোগ ও উৎপাদনব্যবস্থা এখন বড় ঝুঁকি হিসেবে সামনে এসেছে।

ইংল্যান্ডের অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গবেষক জিয়াদ আল-হাশিমি আল জাজিরাকে বলেন, বর্তমান সংকট ইরাকের অর্থনীতিতে থাকা গভীর ভারসাম্যহীনতা প্রকাশ করেছে। অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো কার্যকর কাঠামো দেশটিতে যথেষ্ট শক্তিশালী নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তার মতে, সংকট মোকাবিলায় ইরাক সরকারের তাৎক্ষণিক বিকল্পও খুব বেশি নেই। স্বল্পমেয়াদে ঋণ নেওয়া বা কিছু সীমিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলেও এগুলো স্থায়ী সমাধান নয়।

আল-হাশিমির মতে, দীর্ঘমেয়াদে ইরাককে তেল রপ্তানির বাজার বহুমুখী করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ব্যয় আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

চলমান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা কতদিন স্থায়ী হবে, তার ওপরই এখন অনেকাংশে নির্ভর করছে ইরাকের তেল রপ্তানি, আমদানি সরবরাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের পরিস্থিতি। তবে বর্তমান সংকট দেশটির তেলনির্ভর অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন