- ০৩ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে যৌন নির্যাতন এবং সেই দৃশ্য ধারণ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ভয়াবহ অপরাধ বিশ্বজুড়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; বরং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সংগঠিত নেটওয়ার্ক এবং নারীবিদ্বেষী সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত একটি বড় ধরনের সাইবার অপরাধ।
ইংল্যান্ডের ডেভনের বাসিন্দা ওয়াটস নামের এক নারী জানিয়েছেন, তার সাবেক স্বামী দীর্ঘদিন ধরে তাকে না জানিয়ে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে যৌন নির্যাতন করতেন এবং ছবি-ভিডিও ধারণ করতেন। পরে তিনি জানতে পারেন, এসব ছবি অনলাইনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ওয়াটস বলেন, একসময় তার স্বামী নিজেই তাকে জানিয়েছিলেন তিনি কী করছেন। তবে তখনও তিনি বুঝতে পারেননি যে তাকে কীভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। ২০২২ সালে ওই ব্যক্তিকে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ওয়াটস জানান, তার সাবেক স্বামীর একাধিক অনলাইন অ্যাকাউন্ট ছিল এবং সেখান থেকেই তার ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল। এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে তিনি আরেক ভুক্তভোগী আমান্ডা স্ট্যানহোপকে সঙ্গে নিয়ে ‘#EndEyeCheck’ নামে একটি প্রচারণা শুরু করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অচেতন বা ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা ব্যক্তিকে যৌনভাবে উপস্থাপন করে তৈরি করা এক ধরনের পর্নোগ্রাফির বাজার রয়েছে, যেখানে অনেক সময় বাস্তব নির্যাতনের ঘটনাও যুক্ত হয়ে যায়। এসব ভিডিওতে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর চোখের পাতা তুলে ‘আই চেক’ করার মতো নিষ্ঠুর পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় ব্যক্তি অচেতন কি না।
অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধ গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক এমা কুইল্টি বলেন, এ ধরনের অপরাধ অনেক সময় পারিবারিক বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সহিংসতা হিসেবে দেখা হয়। ফলে এর পেছনে থাকা বৃহত্তর অনলাইন নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং কাঠামোগত ব্যর্থতা আড়ালে থেকে যায়।
তিনি বলেন, সংগঠিত অপরাধের মতো এসব নেটওয়ার্ক পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিয়ম প্রয়োগের দুর্বলতা এবং নারীদের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব।
সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানিতে একদল পুরুষকে মাদক প্রয়োগ করে নারীদের ধর্ষণ এবং সেই ভিডিও একটি অনলাইন গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ‘ড্রাইভিং স্কুল’ নামে পরিচিত একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে এসব অপরাধের ভিডিও বিনিময় করা হতো বলে জানা গেছে।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) জানিয়েছে, তারা মাদক ব্যবহার করে যৌন নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের ২৭০ সদস্যকে শনাক্ত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ইউরোপোলের ‘প্রজেক্ট মেডুসা’ও এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত একটি নেটওয়ার্কে ১৫৬ জন অপরাধী ও ভুক্তভোগীর তথ্য শনাক্ত করেছে।
২০২৪ সালে ফ্রান্সের জিসেল পেলিকো মামলার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে এই ধরনের অপরাধ। অভিযোগ ছিল, প্রায় এক দশক ধরে পেলিকোর স্বামী তাকে অচেতন করে অন্য পুরুষদের দিয়ে যৌন নির্যাতন করান এবং অনলাইনের মাধ্যমে তাদের যুক্ত করেন।
এ ছাড়া সম্প্রতি সিএনএনের এক অনুসন্ধানে টেলিগ্রামে ‘রেপ একাডেমি’ নামে একটি গ্রুপের অস্তিত্বের তথ্য উঠে আসে, যেখানে যৌন নির্যাতনের কৌশল, অভিজ্ঞতা এবং হামলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হতো।
গবেষকদের মতে, টেলিগ্রামের মতো কিছু প্ল্যাটফর্ম এ ধরনের অপরাধী নেটওয়ার্কের জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে। এনক্রিপশন সুবিধা, পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ এবং দুর্বল কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে অপরাধীরা এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এ ধরনের অপরাধে জড়িত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা এখনো নিশ্চিত নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার মানুষ এসব নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। বিভিন্ন দেশে কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার সদস্যের অনলাইন গ্রুপ শনাক্ত হয়েছে।
ওয়াটস জানান, তার প্রচারণা শুরুর পর ২২টি দেশের নারীরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাদের অনেকেই একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, অনেক ভুক্তভোগীকেই সমাজে এমনভাবে দেখা হয় যেন নির্যাতনের জন্য তারাই দায়ী। অথচ অচেতন অবস্থায় থাকা কোনো ব্যক্তি কখনো সম্মতি দিতে পারেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অপরাধের শিকার ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন মানসিক আঘাত বহন করেন। উদ্বেগ, হতাশা, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি), সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, আত্মসম্মানবোধের সংকট এবং আত্মহানির চিন্তার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
ওয়াটস বলেন, তার চার সন্তান রয়েছে এবং তিনি ভেবেছিলেন স্বামীর সঙ্গে পুরো জীবন কাটাবেন। কিন্তু সেই বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার পর তার জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে।
তিনি বলেন, একজন জীবনসঙ্গীই যে অপরাধী হতে পারেন, তা অনেকের কল্পনার বাইরে। তাই এ বিষয়ে নারীদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় আলাদা করে তথ্য সংগ্রহ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অস্ট্রেলীয় গবেষক কুইল্টির মতে, মাদক ব্যবহার করে ধর্ষণের ঘটনাগুলো আলাদা পরিসংখ্যান হিসেবে নথিভুক্ত করা দরকার, যাতে সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সমস্যার প্রকৃত মাত্রা বুঝতে পারে।
তিনি আরও বলেন, শুধু অপরাধীকে নয়, এমন অপরাধের জন্য ব্যবহৃত ওয়েবসাইট ও প্ল্যাটফর্মের মালিকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ওয়াটসের মতে, ভুক্তভোগীদের প্রথম প্রয়োজন বিশ্বাস করা। তিনি বলেন, অনেক সময় অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই অভিযোগকারী নারীকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। এই মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি।
তার ভাষায়, “মানুষকে জানতে হবে এই ধরনের অপরাধ কীভাবে ঘটে, যাতে কেউ নিজের সম্পর্কের মধ্যেও সম্ভাব্য ঝুঁকি চিনতে পারে।”