- ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ছে। পরিস্থিতির মধ্যে দেশটির পাশে প্রতিরক্ষা সহায়তা জোরদার করছে মিত্ররা। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা রক্ষায় সেনা, রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স। একই সঙ্গে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে জরুরি সামরিক বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে রিয়াদ।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবু বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষায় ফ্রান্স সেনা সদস্য, রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠাবে। তবে এর মাধ্যমে কোনো সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়া ফ্রান্সের উদ্দেশ্য নয় বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের ইয়ানবুতে বড় ধরনের তেল সংরক্ষণ ও পরিশোধন স্থাপনা রয়েছে। দেশটির পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরের এই বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনও ইয়ানবুর সঙ্গে যুক্ত। পাইপলাইনটির পূর্ণ সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের।
হুথিদের হামলার পর সৌদি আরবের এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো এখন বাড়তি নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়েছে। বৃহস্পতিবার হুথিরা ইয়ানবুতে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর স্থাপনা এবং রাজধানী রিয়াদে একটি ‘সংবেদনশীল লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলার দাবি করে। অন্যদিকে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ইয়ানবু ও তাইফের দিকে ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
হামলার মাত্রা বাড়ার মধ্যেই সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা নিউইয়র্কে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তিন দেশের সামরিক প্রধানদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় এই আলোচনা হবে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তবে এই চুক্তির আওতায় তুরস্ক ও পাকিস্তান ঠিক কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সক্রিয় করা হয়েছে কি না, সেটিও পরিষ্কার করা হয়নি। দুই দেশই বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগে যুক্ত রয়েছে।
এদিকে ইয়েমেনের ভেতরেও সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ প্রদেশের বিভিন্ন ফ্রন্টে হুথিদের হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে সরকারি বাহিনী।
ইয়েমেনের হুথিরা সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলে নেওয়ার পর বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছাকাছি তাদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়ে থাকে। ফলে সংঘাতের প্রভাব এখন শুধু সৌদি আরব বা ইয়েমেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থাতেও পড়ছে।
ইয়ানবুকে হামলার কারণে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির ওপরও নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহার করে দেশটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি করতে পারত। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে সেই বিকল্প পথও বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সৌদি আরবের কিছু তেল রপ্তানি আবার হরমুজ প্রণালির দিকে সরাতে হয়েছে।
এর প্রভাব আন্তর্জাতিক তেলের বাজারেও দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের ওপরে ওঠে। পরে শুক্রবার সকালে দাম কিছুটা কমে ১০৫ দশমিক ৭৭ ডলারে নেমে আসে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইয়েমেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ আবদুলকাদের আল-আলিমি-বাওজার হুথিদের বিরুদ্ধে নৌ চলাচলের নিরাপত্তাকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন। তার ভাষ্য, এর প্রভাব পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর পড়ছে।
সৌদি আরবের ওপর হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকায় এখন রিয়াদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্রদের ভূমিকা কতটা বাড়ে, সেদিকেই নজর রয়েছে। বিশেষ করে ফ্রান্সের সরাসরি প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা এবং সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর পরবর্তী পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।