Friday, September 25, 2026

জাপানে স্থায়ী বসবাসের নিয়ম কঠোর, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন বিদেশিরা


ছবিঃ ২৮ জুলাই ২০২২ তারিখে জাপানের টোকিওর শিবুয়া শপিং এলাকায় সুরক্ষামূলক মাস্ক পরিহিত পথচারীরা রাস্তায় হাঁটছেন (সংগৃহীত /আল জাজিরা /ইসেই কাটো/রয়টার্স)

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN

জাপানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত বিদেশিদের জন্য স্থায়ীভাবে দেশটিতে থাকার পথ আরও কঠিন হতে যাচ্ছে। স্থায়ী আবাসনের আবেদনকারীদের আয়, জাপানি ভাষাজ্ঞান, পেনশনসহ আর্থিক সক্ষমতার বিষয়ে নতুন শর্ত আরোপের উদ্যোগে দেশটিতে থাকা অনেক বিদেশির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

জাপানের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নতুন নীতিমালা আগামী ১ অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়ার কথা। নতুন ব্যবস্থায় স্থায়ী আবাসনের আবেদনকারীদের জাপানের গড় পরিবারের আয়ের তুলনায় পর্যাপ্ত বার্ষিক আয় রয়েছে এমন প্রমাণ দিতে হবে। পাশাপাশি জাপানি ভাষায় দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পেনশন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।

টোকিওর উত্তরে বসবাসকারী বাংলাদেশি প্রযুক্তি প্রকৌশলী আবদুল (ছদ্মনাম) প্রায় আট বছর ধরে জাপানে আছেন। স্ত্রীও বাংলাদেশি। দীর্ঘদিনের বসবাসের কারণে নিজের জন্মভূমি বাংলাদেশের তুলনায় জাপানের জীবনযাত্রার সঙ্গেই এখন বেশি অভ্যস্ত তিনি।

কিন্তু নতুন নিয়ম এবং বিদেশিদের নিয়ে বদলে যাওয়া সামাজিক পরিবেশ তাকে ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। স্থায়ী আবাসন ও জাপানের নাগরিকত্ব দুই ধরনের আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তবে দুটিই প্রত্যাখ্যাত হলে জাপান ছাড়ার সম্ভাবনার কথাও মাথায় রাখছেন।

আবদুলের মতো দীর্ঘদিন ধরে জাপানে থাকা বিদেশিদের অনেকেই মনে করছেন, নতুন শর্ত পূরণ করা সবার জন্য সহজ হবে না। বিশেষ করে আয়, ভাষাগত দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতার বিষয়গুলো তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

জাপানের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ নতুন ব্যবস্থার পেছনে বিদেশিদের স্বনির্ভর জীবনযাপন এবং সমাজের ওপর আর্থিক বোঝা না হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে। একই সময়ে দেশটিতে বসবাসের অনুমতি ও সংশ্লিষ্ট আবেদনের ফিও ১ অক্টোবর থেকে পরিবর্তিত হচ্ছে।

জাপানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিক সারাহ নেলকিনও নতুন নিয়ম নিয়ে উদ্বিগ্ন। প্রায় ১৪ বছর ধরে জাপানে বসবাস করছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দেশটিতে আসার পর জাপানের বিনোদন ও অ্যানিমেশন শিল্পে নিজের পেশাজীবন গড়ে তুলেছেন।

নতুন নিয়ম ঘোষণার কিছুদিন আগে স্থায়ী আবাসনের আবেদন করেছিলেন নেলকিন। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে জাপানের নাগরিকত্ব নেওয়ার কথা ভাবছেন তিনি। তবে এর অর্থ হবে মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করা, কারণ জাপান সাধারণভাবে দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃতি দেয় না।

নেলকিনের মতো অনেক দীর্ঘমেয়াদি বিদেশির জন্য বিষয়টি শুধু বসবাসের অনুমতি পাওয়ার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে পরিবার, পেশা, নাগরিকত্ব এবং দীর্ঘদিনের জীবনযাপনের সিদ্ধান্তও জড়িয়ে আছে।

জাপানের জনসংখ্যা দ্রুত কমছে এবং দেশটির বিভিন্ন খাতে শ্রমিকের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদ রিসা হাগিওয়ারার মতে, একদিকে জাপানের অর্থনীতির জন্য বিদেশি কর্মীদের প্রয়োজন বাড়ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের শর্ত কঠোর হলে দক্ষ বিদেশিদের কাছে জাপান আকর্ষণ হারাতে পারে।

তার মতে, বিদেশি কর্মী নেওয়ার পর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশটির কী ধরনের নীতি থাকবে—সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাপানে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিকে দেশটিতে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা ছিল প্রায় ৪১ লাখ ২৫ হাজার, যা আগের দশকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

অন্যদিকে, দেশটির নিজস্ব জনসংখ্যা কমছে। ফলে শ্রমবাজারে বিদেশিদের অংশগ্রহণ বাড়লেও তাদের দীর্ঘমেয়াদি বসবাস ও সামাজিকভাবে একীভূত হওয়ার প্রশ্নটি জাপানে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

জাপানে অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক সাম্প্রতিক সময়ে আরও জোরালো হয়েছে। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে আরও বিদেশি গ্রহণের বিরোধিতা করেছেন ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

গবেষণাটিতে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়স ও লিঙ্গের মানুষের মধ্যেই বিদেশি গ্রহণের বিষয়ে বিরোধিতা বেড়েছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। গবেষকদের বিশ্লেষণে সামাজিক উদ্বেগ ও অসন্তোষের সঙ্গে বিদেশিদের গ্রহণের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাবের সম্পর্কও উঠে এসেছে।

দীর্ঘদিন জাপানে থাকা আবদুলও বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশিদের নিয়ে সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন তিনি বিশেষ করে অনলাইনে লক্ষ্য করছেন। নেলকিনও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

জাপানের অভিবাসন নীতির পরিবর্তন দেশটির রাজনীতিতে বিদেশিদের নিয়ে বাড়তে থাকা বিতর্কের মধ্যেই ঘটছে। রক্ষণশীল রাজনীতিতে অভিবাসন, বিদেশিদের আচরণ এবং সামাজিক সংহতির বিষয়গুলো সাম্প্রতিক সময়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশেষ করে অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত সানসেইতো পার্টি সাম্প্রতিক নিম্নকক্ষ নির্বাচনে ১৫টি আসন পেয়ে বড় বিরোধী দলগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। দলটির প্রচারে ‘জাপান ফার্স্ট’ ধরনের বার্তা গুরুত্ব পেয়েছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন জোটও বিদেশিদের নিয়ম ভঙ্গের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং বিদেশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সম্ভাব্য সামাজিক সমস্যাগুলো মোকাবিলার কথা জানিয়েছে।

তবে জাপানের অর্থনীতি যখন জনসংখ্যাগত সংকট ও শ্রমিক ঘাটতির মুখে, তখন বিদেশি কর্মীদের প্রয়োজন এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের শর্ত এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে, সেটিই সামনে বড় নীতিগত প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘদিন ধরে জাপানে বসবাসকারী আবদুলের মতো বিদেশিদের কাছে তাই বিষয়টি শুধু নতুন অভিবাসন নীতির পরিবর্তন নয় এটি তাদের গড়ে তোলা জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জাপানে থাকবে কি না সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন