- ০৩ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
জাপানি মুদ্রা ইয়েনের টানা দরপতন ঠেকাতে বিরল সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়েছে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র। ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর ইয়েনের দর বাড়াতে যৌথভাবে বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে দুই দেশ। টোকিও জানিয়েছে, পরিস্থিতি প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অতিরিক্ত অস্থিরতা ও বাজারে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ইয়েন কেনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও দুই দেশের যৌথ উদ্যোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রোববার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ইয়েন দুর্বল হয়ে পড়ায় জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছিল। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার স্বার্থে ওয়াশিংটন জাপানের পাশে দাঁড়িয়েছে।
যৌথ হস্তক্ষেপের খবর প্রকাশের পরই বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ইয়েনের বড় উত্থান দেখা যায়। একপর্যায়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে জাপানি মুদ্রাটির দর প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি ডলারে ১৫৫ দশমিক ২০ ইয়েনে পৌঁছায়, যা প্রায় তিন মাসের মধ্যে ইয়েনের সর্বোচ্চ অবস্থান। এর আগের দুই কার্যদিবসেও ডলারের বিপরীতে ইয়েন প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছিল।
শুধু ডলারের বিপরীতেই নয়, ইউরো ও ব্রিটিশ পাউন্ডসহ অন্যান্য প্রধান মুদ্রার বিপরীতেও ইয়েনের দর বেড়েছে। অন্যদিকে ইয়েন কেনার চাপ বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দুর্বল হয়েছে মার্কিন ডলার।
সোমবার এশীয় লেনদেনের শুরুতে ইউরোর মূল্য প্রায় দেড় মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে ১ দশমিক ১৫৫৯ ডলারে পৌঁছায়। ব্রিটিশ পাউন্ডও প্রায় দুই সপ্তাহের সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি ছিল।
তবে ইয়েনের দ্রুত শক্তিশালী হওয়া জাপানের শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আগের কার্যদিবসে এক সপ্তাহের সর্বোচ্চ অবস্থানে ওঠার পর সোমবার নিক্কেই সূচক বড় ধরনের পতনের মুখে পড়ে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইয়েন ও জাপানি সরকারি বন্ডের ব্যাপক বিক্রির কারণে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব ঠেকাতেই সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়েছে টোকিও ও ওয়াশিংটন। এ উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের বাড়তে থাকা মুনাফার হার বা ইয়িল্ডের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টাও করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে ইয়েনের দরপতন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে জাপান। দুর্বল মুদ্রার কারণে দেশটিতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের দামে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপ প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির জনপ্রিয়তায়ও প্রভাব ফেলছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে।
জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইয়েনের বাজারে দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক ওঠানামা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিত হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, বাজারে অস্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকলে নতুন করে যৌথ হস্তক্ষেপের বিষয়ে তারা দ্বিধা করবে না।
২০১১ সালের পর এবারই প্রথম ইয়েনের বিনিময় হার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান একসঙ্গে সরাসরি বাজারে হস্তক্ষেপ করল। ২০১১ সালে জাপানের পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির পর ইয়েনের অতিরিক্ত শক্তিশালী হওয়া ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের বাজারে ইয়েন কিনতে টোকিও প্রায় ৫ হাজার ৮৯৭ কোটি ডলার বিক্রি করে থাকতে পারে। এর পরদিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে আরও একটি হস্তক্ষেপের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও জাপানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ইয়েনের মূল্যকে আরও স্থিতিশীল করতে প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতেও যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে। তিনি মনে করেন, ইয়েনের মূল্য দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত অবস্থানের তুলনায় কম রয়েছে এবং তা সংশোধনে জাপানের পদক্ষেপকে ওয়াশিংটন সমর্থন করে।
একই সঙ্গে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বেসেন্ট। তার এই অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও দ্রুত সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। যদিও সর্বশেষ বৈঠকে ব্যাংকটি মুদ্রানীতি অপরিবর্তিত রেখেছে।
ইয়েনের পতন ঠেকাতে জাপান এর আগেও চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে বাজারে হস্তক্ষেপ করেছিল। তবে সে সময় মুদ্রাটির দর সাময়িকভাবে বাড়লেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। জুনে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে ১ শতাংশে উন্নীত করলেও ইয়েনের দুর্বলতা পুরোপুরি কাটেনি।
এদিকে, আঞ্চলিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা সামাল দিতে দক্ষিণ কোরিয়াও বৃহস্পতিবার নিজস্ব মুদ্রা উন কিনতে বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, জাপান-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ পদক্ষেপের পর এশিয়ার অন্যান্য দেশও নিজেদের মুদ্রার দর রক্ষায় আরও সক্রিয় হতে পারে।