- ০৩ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | PNN
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার পথে নতুন অগ্রগতির ঘোষণা দেওয়ার পরও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটিতে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। রোববার বিভিন্ন এলাকায় বিমান ও ড্রোন হামলায় অন্তত ১৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, পশ্চিম গাজা সিটির আল-সুসি টাওয়ারের একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে ইসরায়েলি বিমান হামলায় একই পরিবারের তিনজন নিহত হন। তারা হলেন—৩৩ বছর বয়সী আবদুল্লাহ আবু তাইফ, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ২৯ বছর বয়সী আবির আনান এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে আজম।
খান ইউনিস শহরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আল-কারারা এলাকায় একটি বাড়িতে হামলায় আল-হামস পরিবারের তিন সদস্য নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন পরিবারের কর্তা মাহমুদ আল-হামস, তার স্ত্রী ফাতিমা এবং তাদের ছোট মেয়ে। এ হামলায় আরও তিনজন আহত হয়েছেন।
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় নিজ বাড়িতে হামলায় ৬৮ বছর বয়সী কামু আবু মুয়াইলিক ও তার ৫৯ বছর বয়সী স্ত্রী হুদা নিহত হন। একই এলাকায় মোটরসাইকেলে চলাচলের সময় হামলায় দুই ভাইয়েরও মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় চিকিৎসাসূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরে সরাসরি হামলায় একজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি তাঁবুতে হামলায় একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হন।
গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলীয় রেমাল এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের একটি তাঁবুতে ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, শহরের একটি গাড়িতে হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও চারজন।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের তুলনায় রোববারের হামলায় এক দিনে প্রাণহানির সংখ্যা ছিল বেশি। গাজার বিভিন্ন এলাকায় ভোর থেকে একের পর এক হামলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগের দিন দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতালসংলগ্ন ওষুধের গুদামে হামলার ঘটনা ঘটে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বুরশ বলেন, চিকিৎসাসামগ্রীর অবকাঠামো ধ্বংসের ফলে সংকট আরও গভীর হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় দুটি স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস এবং আরও দুটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার বিভিন্ন এলাকায় গত ৪৮ ঘণ্টায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান নিচু দিয়ে উড়ে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক হামলার আগে কোনো সতর্কবার্তা বা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
তবে ইসরায়েলের দাবি, হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলোর সঙ্গে হামাস বা অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি বাসিন্দারা বলছেন, আবাসিক ভবন, তাঁবু ও বেসামরিক লোকজনের অবস্থানস্থলে হামলার কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
এ হামলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে। ওয়াশিংটনের প্রস্তাবিত কাঠামোতে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ধাপে ধাপে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে।
তবে পরিকল্পনার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, হামাস সম্পূর্ণভাবে অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করা হবে না।
ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেনও বলেছেন, শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চললেও হামলা বন্ধ রাখার বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতামূলক সমঝোতা হয়নি। হামাস নিরস্ত্রীকরণে ব্যর্থ হলে গাজার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পক্ষে অবস্থান জানান তিনি।
অন্যদিকে হামাস অভিযোগ করেছে, মধ্যস্থতাকারী ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সমঝোতাকে বাধাগ্রস্ত করতেই ইসরায়েল হামলা বাড়িয়েছে। হামাসের দাবি, রোববার সকাল থেকে ইসরায়েলি হামলায় ১৮ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং বেশ কয়েকটি পারিবারিক বাড়ি ধ্বংস হয়েছে।
গাজাবাসীর অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও হামলা ও মানবিক সহায়তার ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকায় বাস্তবে শান্তির কোনো সুফল মিলছে না। তাদের মতে, কাগজে-কলমে সমঝোতা থাকলেও মাঠপর্যায়ে সংঘাতের চিত্র বদলায়নি।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ২২২ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪ হাজার ৫৩ জন আহত হয়েছেন।
এদিকে গাজার জন্য গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর প্রধান দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ জানিয়েছেন, উত্তেজনা কমানো এবং প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে মধ্যস্থতাকারীরা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন।