- ০৩ আগস্ট, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
তুরস্কের একসময়ের প্রভাবশালী রাজনীতিক, কূটনীতিবিদ ও চিন্তাবিদ আহমেত দাভুতওলু দলীয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। নিজের প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দল ‘ফিউচার পার্টি’র রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্তের পর তিনি জানিয়েছেন, এটি কোনো পরাজয় নয়; বরং তুরস্কের বর্তমান ‘দূষিত রাজনৈতিক পরিবেশ’ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার একটি সিদ্ধান্ত।
দাভুতওলুর রাজনৈতিক যাত্রা ছিল উত্থান-পতনে ভরা। একসময় তিনি ছিলেন প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন। তুরস্কের উচ্চাভিলাষী পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম নির্মাতা হিসেবে তিনি পরিচিতি পান। দায়িত্ব পালন করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর পদে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থারই সমালোচক হয়ে ওঠেন, যা গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
তাঁর বিদায় তুরস্কের রাজনীতিতে একটি বিতর্কিত অধ্যায়ের সমাপ্তি টানছে। বিশ্লেষকদের মতে, একজন বুদ্ধিজীবী ও কূটনীতিক হিসেবে দাভুতওলু দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান বদলাতে সক্ষম হলেও স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজের ভিত্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
১৯৫৯ সালে তুরস্কের কোনিয়া প্রদেশের তাশকেন্টে জন্মগ্রহণ করেন দাভুতওলু। বোগাজিচি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার পর তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। মালয়েশিয়া ও তুরস্কের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘হোজা’ নামে, যার অর্থ অধ্যাপক। পরবর্তী সময়ে সরকারি দায়িত্বে গেলেও এই পরিচয় তাঁর সঙ্গে থেকে যায়।
দাভুতওলু সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পান তাঁর ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ বা কৌশলগত গভীরতার তত্ত্বের কারণে। তাঁর ধারণা ছিল, তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থান, উসমানীয় ইতিহাস এবং মধ্যপ্রাচ্য, বলকান, ককেশাস ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক দেশটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত করতে পারে।
২০০২ সালে একে পার্টি (AK Party) ক্ষমতায় আসার পর তিনি এরদোয়ানের প্রধান পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা হন। ২০০৯ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ২০১১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
দাভুতওলুর সময়ে তুরস্ক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করে। দেশটি আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক উপস্থিতি বাড়ায়, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করে এবং ভিসা সহজীকরণের উদ্যোগ নেয়।
এই নীতিকে বলা হতো ‘প্রতিবেশীদের সঙ্গে শূন্য সমস্যা’ কৌশল।
তুরস্কের রক্ষণশীল রাজনৈতিক চিন্তাধারা নিয়ে কাজ করা লেখক ও বিশ্লেষক তারিক চেলেঙ্কের মতে, দাভুতওলু দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিন্তাধারায় পরিবর্তন এনেছিলেন। তাঁর মাধ্যমে কূটনীতিতে ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ বাড়ে।
দাভুতওলু বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রাখার নীতিকে বলেছিলেন ‘রিদমিক ডিপ্লোম্যাসি’। এর মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, হামাসসহ ভিন্ন অবস্থানের পক্ষগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেন।
তবে সিরিয়া যুদ্ধ তাঁর কূটনৈতিক দর্শনের বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। তুরস্ক সিরিয়ার বিরোধীদের সমর্থন করেছিল এবং ধারণা করেছিল বাশার আল-আসাদ সরকার দ্রুত পতন হবে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে তৈরি হয় শরণার্থী সংকট, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও আঞ্চলিক অস্থিরতা।
বিশ্লেষকদের মতে, দাভুতওলুর বড় সীমাবদ্ধতা ছিল আদর্শবাদ ও বাস্তব রাজনীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে না পারা।
২০১৪ সালে এরদোয়ান প্রধানমন্ত্রী পদ ছেড়ে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর দাভুতওলুকে একে পার্টির নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন।
তবে তখন থেকেই ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও এরদোয়ান প্রেসিডেন্ট হিসেবে দল ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বজায় রাখেন।
২০১৫ সালে দাভুতওলুর নেতৃত্বে একে পার্টি দুটি নির্বাচনে অংশ নেয়। জুনে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও নভেম্বরে আবার বড় জয় পায় দলটি। কিন্তু এই জয় দাভুতওলুকে স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি দেয়নি।
নিয়োগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় নিয়ে মতবিরোধের পর ২০১৬ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
এরপর আরও কয়েক বছর একে পার্টিতে থাকার পর ২০১৯ সালে দল ত্যাগ করে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফিউচার পার্টি’।
দাভুতওলুর দল এরদোয়ানবিরোধী রক্ষণশীল ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। দলটি সংসদীয় গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও জবাবদিহিমূলক সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয়।
কিন্তু নির্বাচনী মাঠে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করতে পারেনি দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বার্ক এসেনের মতে, তুরস্কের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন দলের রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও গণমাধ্যমে প্রভাবের কারণে বিরোধী দলগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন। তবে শুধু এই কারণেই ফিউচার পার্টির ব্যর্থতা ব্যাখ্যা করা যায় না বলেও তিনি মনে করেন।
২০২৩ সালের নির্বাচনে ফিউচার পার্টির প্রার্থীরা প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (CHP) তালিকায় অংশ নিয়ে সংসদে জায়গা পান। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এতে দলটির নিজস্ব সাংগঠনিক পরিচয় আরও দুর্বল হয়েছে।
দাভুতওলু এখন দলীয় রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন। তবে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ও কূটনৈতিক উত্তরাধিকার তুরস্কের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একজন রাজনীতিক হিসেবে তিনি কাঙ্ক্ষিত বিকল্প শক্তি গড়ে তুলতে না পারলেও একজন চিন্তাবিদ ও কূটনীতিক হিসেবে তাঁর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
দাভুতওলুর রাজনৈতিক বিদায় এমন এক সময়ে এলো, যখন তুরস্কে গণতন্ত্র, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হচ্ছে।