Monday, August 3, 2026

লক্ষ্মীপুরের মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন


ছবিঃ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ মজুমদার (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। লক্ষ্মীপুর

লক্ষ্মীপুরের হায়দরগঞ্জ তাহেরিয়া আরএম কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ মজুমদারের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হচ্ছে। অনিয়মের প্রতিবাদ করলে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তারা। তবে অধ্যক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তাকে হয়রানি ও অপমান করার উদ্দেশ্যে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১১ বছর ধরে নিয়মিত অডিট ছাড়াই মাদ্রাসার কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেন। পরে তারা ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন।

শিক্ষকদের অভিযোগ, আন্দোলনের পর দীর্ঘ সময় অধ্যক্ষ প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকলেও পরে আবার দায়িত্বে ফিরে আসেন। এরপরও আগের মতোই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও গভর্নিং বডি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি অভ্যন্তরীণ অডিট প্রতিবেদনে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ১ কোটি ২৯ লাখ ৭১ হাজার ৭০৬ টাকার আদায়যোগ্য অডিট আপত্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ভাউচার জালিয়াতি, কর পরিশোধে অনিয়ম, বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় এবং আর্থিক স্বচ্ছতার ঘাটতির বিষয় উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে। এছাড়া বিভিন্ন ভাউচারের মাধ্যমে ৪৮ লাখ টাকার বেশি অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে সরানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিযোগ, যাতায়াত না করেও ব্যয় দেখানো, একই ভাউচার একাধিকবার ব্যবহার, বাসা ভাড়া, মোবাইল ও ইন্টারনেট বিলসহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। করোনা মহামারির সময়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সময়ও যাতায়াত ও আপ্যায়ন বাবদ অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ করেছেন তারা।

এছাড়া ছাত্রাবাসের ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন, শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের টাকা ও বেতন আদায়ে অনিয়মসহ বিভিন্ন আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগও রয়েছে।

শিক্ষকদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গভর্নিং বডির নির্দেশে একটি অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটি গঠন করা হলেও সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। পরে অন্য একটি অডিট ফার্মের মাধ্যমে অডিট করা হলেও তার ফলাফলও প্রকাশ করা হয়নি বলে দাবি তাদের।

তাদের অভিযোগ, গভর্নিং বডি অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই না করে তাকে দায়মুক্তি দিয়েছে।

তবে গভর্নিং বডির সভাপতি মাওলানা সাইয়্যেদ মো. আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবিরী আল মাদানী বলেন, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। সরকারি অডিটের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, “সরকারি তদন্তে যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যায়কে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।”

অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ মজুমদার বলেন, তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত অডিট প্রতিবেদন সঠিক নয় এবং এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি করা হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, অডিটের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবেদন তার মাধ্যমে গভর্নিং বডির সভাপতির কাছে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি ওই প্রতিবেদন পাননি। আন্দোলনের সময় কিছু ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র নিয়ে নিজেদের মতো করে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

অধ্যক্ষ আরও বলেন, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে তিনি লিখিত জবাব দিয়েছেন এবং বর্তমানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন।

ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু জাফর খান বলেন, বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে অভিযোগ এলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, কোনো অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে প্রথমে তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি যাচাই করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

উপাচার্য আরও বলেন, “আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আইনের মধ্যে থেকে ন্যায়সংগতভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে অবশ্যই বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাউছার জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বর্তমানে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন