Monday, August 3, 2026

মহিপাল হত্যাকাণ্ডের দুই বছর: মূল অভিযুক্তরা অধরা, উদ্ধার হয়নি ব্যবহৃত অস্ত্র


ছবিঃ আন্দোলনে ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত সশস্ত্র নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় মহিপাল এলাকা। গুলিতে প্রাণ হারান সাত আন্দোলনকারী (সংগৃহীত)

PNN নিউজ ডেস্ক। ফেনী

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। সরকারবিরোধী একদফা আন্দোলনে সারা দেশ যখন উত্তাল, তখন ফেনীর মহিপাল এলাকাও পরিণত হয় সংঘর্ষের কেন্দ্রস্থলে। শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে সেদিন সড়কে নেমেছিলেন হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মধ্যেই সশস্ত্র হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে সাত আন্দোলনকারী নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন।

ওই ঘটনার পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠা মূল পরিকল্পনাকারী ও অধিকাংশ অস্ত্রধারী এখনো গ্রেফতারের বাইরে রয়েছেন বলে দাবি করেছেন আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা। হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোরও সন্ধান মেলেনি।

প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ৪ আগস্ট সকাল থেকেই ফেনী জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে জড়ো হতে শুরু করেন। তারা সেখানে স্লোগান ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।

অন্যদিকে ফেনী শহরের ট্রাংক রোড এলাকায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।

বেলা ১টার দিকে যোহরের আজান হলে আন্দোলনকারীরা মহাসড়কেই নামাজ আদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় ট্রাংক রোডের দিক থেকে সশস্ত্র নেতাকর্মীরা মহিপালের দিকে এগিয়ে এসে গুলিবর্ষণ শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গুলিতে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহত হন। আহতদের দ্রুত ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আরও দুজনের মৃত্যু হয়। হামলায় শতাধিক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ গুলিবিদ্ধ ও আহত হন।

মহিপালে নিহত সাতজন হলেন—শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ, মো. মাহবুবুল হাসান, মো. সারোয়ার জাহান, ওয়াকিল আহমেদ, ছাইদুল ইসলাম, জাকির হোসেন এবং অটোরিকশাচালক মো. সবুজ।

আন্দোলনে অংশ নিয়ে ফেনীর আরও চার বাসিন্দা ঢাকা ও চট্টগ্রামে নিহত হন।

মহিপালের ঘটনার একদিন পর, ৫ আগস্ট, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে। তবে সরকার পরিবর্তনের দুই বছর পরও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অনেককে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ আন্দোলনকারীদের।

মহিপাল হত্যাকাণ্ড ও সংশ্লিষ্ট সহিংসতার ঘটনায় ফেনী সদর মডেল থানায় মোট ২২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি হত্যা এবং ১৫টি হত্যাচেষ্টার মামলা। ইতোমধ্যে তিনটি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

মামলাগুলোতে ২ হাজার ১৯৯ জনের নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও প্রায় ৪ হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামির তালিকায় রাখা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ফেনীর সাবেক তিন সংসদ সদস্য এবং জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এজাহারভুক্ত ও অজ্ঞাতনামা আসামিসহ এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী এবং গুলিবর্ষণে অংশ নেওয়া অধিকাংশ অস্ত্রধারী এখনো পলাতক।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে সেদিন অন্তত ৩০ জনকে পিস্তল, রাইফেল ও শটগান হাতে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে নূর নবী মেম্বার ও যুবলীগ নেতা সম্রাট গ্রেফতারের পর আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে ছবিতে দেখা অন্য অনেক অস্ত্রধারীকে এখনো গ্রেফতার করা যায়নি। তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ফেনীর সাবেক জেলা সমন্বয়ক এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব মুহাইমিন তাজিম বলেন, সংঘাত এড়ানোর লক্ষ্যেই মহিপালকে কর্মসূচির স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, “সেখানে আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চলছিল। কিন্তু সশস্ত্র হামলা চালিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করা হয়। দুই বছর পার হলেও সেই দিনের ভয়াবহ স্মৃতি এখনো আমাদের তাড়া করে বেড়ায়।”

মুহাইমিন তাজিমের অভিযোগ, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেক ব্যক্তি এখনো এলাকায় কিংবা দেশের ভেতরে অবস্থান করছেন। তাদের কেউ কেউ আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে হুমকিও দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, “এটি প্রশাসনের ব্যর্থতা। দুই বছরেও নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার—দুটোর কোনোটিই পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি।”

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, আহতদের উন্নত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং সব হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফৌজুল আজিম বলেন, গুলিবর্ষণের সঙ্গে জড়িত অনেক অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তাদের ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোর অবস্থান সম্পর্কে এখনো নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ঘটনার পর অস্ত্রগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া হত্যা ও সহিংসতার মামলাগুলোর তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।

তিনি বলেন, “প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”

পুলিশ সুপার জানান, মহিপালের ঘটনায় সাতটি হত্যা ও ১৫টি আহতের মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় আড়াই হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে এবং এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, হামলায় অস্ত্র ব্যবহারকারী অধিকাংশ ব্যক্তি এখনো পলাতক। তবে তাদের গ্রেফতার এবং ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

দুই বছর পরও মহিপালের সেই রক্তাক্ত দিনের স্মৃতি বহন করছেন নিহতদের স্বজন, আহত ব্যক্তি ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষ। তাদের প্রত্যাশা, ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নিশ্চিত হবে ন্যায়বিচার।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন