Wednesday, August 5, 2026

৩৬ জুলাই: খুলনার বারুদ, গণভবনের পতন ও একটি নতুন বাংলাদেশের সূর্যোদয়


ছবিঃ জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ (সংগৃহীত)


বিশেষ প্রতিবেদনঃ আজাদুল হক আজাদ

বাংলাদেশ ও বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এক নজিরবিহীন অধ্যায়। পঞ্জিকার পাতায় তারিখটি ছিল ৫ আগস্ট কিন্তু রক্তে কেনা মুক্তির উন্মাদনায় তা রূপ নিয়েছিল ‘৩৬ জুলাই’-এ। এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের বীজ রোপিত হয়েছিল তার আগের দিনই, বিশেষ করে রূপসা-ভৈরব পাড়ের খুলনায়।

৪ আগস্ট: খুলনার রাজপথে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ৪ আগস্ট শহর জুড়ে তৈরি হয়েছিল এক অভূতপূর্ব প্রতিরোধ দুর্গ। সকাল থেকেই শিববাড়ী মোড়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা জড়ো হতে থাকেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, স্থানীয় কলেজ ছাত্র এবং সাধারণ পেশাজীবীদের স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। আওয়ামী-প্রশাসন ও তৎকালীন শাসকদলের ক্যাডার বাহিনীর যৌথ টিয়ারশেল, শটগানের ছররা গুলি এবং সাউন্ড গ্রেনেডের হুমকির মুখেও রাজপথ ছাড়েনি আন্দোলনকারীরা।

আক্ষরিক অর্থেই ৪ আগস্ট খু্লনাতে ভেঙে পড়ে হাসিনার একনায়কতন্ত্রের অনুগত ‘প্রশাসন’ নামক মূর্তিমান ভয়ের দেয়াল। শেখবাড়ি (শেখ হাসিনার চাচা ও শেখ হেলালদের নিজ বাড়ি) এবং জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়সহ একাধিক আওয়ামীপন্থী নেতার বাড়িতে জনতার ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। আওয়ামী পার্টি অফিস ও অন্যান্য একাধিক স্থানে মুখোমুখি সংঘর্ষে রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ কিন্তু জনতার গর্জনের সামনে টিকতে পারেনি শাসকদলের স্থানীয় কার্যালয় ও প্রভাবশালীদের কোন দুর্গ। সেদিনই খুলনার রাজপথ থেকে কার্যত ঘোষিত হয়েছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনব্যবস্থার পতন -- খুলনা মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয়েছিল সেই দিন সন্ধ্যার মধ্যেই।

৩৬ জুলাই: ধরা হয় -- গণবিস্ফোরণ ও চূড়ান্ত অন্তর্ধান খুলনার সেই অদম্য প্রতিরোধের উত্তাপ ও সাহসের প্রতিধ্বনি নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। 

এলো সেই প্রতীক্ষিত ৫ আগস্ট -- আন্দোলনের পরিভাষায় ‘৩৬ জুলাই’। আগের রাতে ঘোষিত ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ পরিণত হলো এক বাঁধভাঙা জনসমুদ্রে। কোনো কারফিউ, কোনো বুলেটের ভয় সেদিন থামিয়ে রাখতে পারেনি ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক-জনতা বা সর্বস্তরের মেহনতি মানুষকে।

রাজধানী অভিমুখে লাখ লাখ মানুষের যে স্রোত ধেয়ে এসেছিল, তার মুখে দীর্ঘ পনেরো বছরের জাঁকিয়ে বসা দুঃশাসনের ভিত মুহূর্তে ধসে পড়ে। যে কণ্ঠ থেকে বারবার উচ্চারিত হতো "হাসিনা পালায় না"---পরিস্থিতির কঠিন সত্যের মুখে তাকে পেছনের গলিপথ দিয়েই সপরিবারে নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে হলো বা এই ভূখণ্ডের মহাফ্যাসিস্ট-স্বৈরাচার পালাতে বাধ্য হলো।

'২৪-এর জেন-জি প্রজন্ম ও মুক্তিকামী জনতার বিজয় বাংলাদেশী বাঙালির মুক্তির ইতিহাস ধারাবাহিক --- ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের আত্মমর্যাদার ঐতিহ্যকে ২০২৪-এর প্রজন্ম নতুন করে জীবিত করেছে। শিববাড়ী মোড়সহ করে সারা দেশের রাজপথে উচ্চারিত "৪৭, ৫২, ৭১ মতোই নতুন ইতিহাস লিখছে '২৪-এর প্রজন্ম"। এটা যে কোনো ফাঁকা বুলি ছিল না; বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে এই প্রজন্ম তা প্রমাণ করেছে।

যখন শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত খবর -- "পালাইছে রে পালাইছে, খুনি হাসিনা পালাইছে", তখন বাঁধভাঙা আনন্দে জেগে উঠল অলি থেকে গলি, রাজপথ থেকে ঘরের ছাদ। সেই দৃশ্য কোনো কবি বা সাহিত্যিকের কলমে পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলা বা কোন চিত্রশিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা সম্ভব ছিল না; কারণ এর পেছনে ছিল হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ ও লাখো সহযোদ্ধার রক্ত।

৩৬ জুলাইয়ের বিজয় প্রমাণ করেছে যে, জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তির সামনে কোনো ফ্যাসিস্ট-স্বৈরাচারই চিরস্থায়ী হতে পারে না। খুলনাসহ বাংলাদের প্রতিটি নগর-শহর প্রান্তরের রক্তাক্ত সড়ক থেকে ঢাকার গণভবন -- সর্বত্র একটাই বার্তা স্পষ্ট হয়েছে: ভয়কে জয় করে অধিকার আদায় করার নামই '২৪-এর গণঅভ্যুত্থান। 

এক দ্বিচারী শাসনের পতনের পর এখন সময় -- সেই রক্তের ঋণে একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার। এখন সময় প্রমাণ করার "সবার আগে বাংলাদেশ।

কলামিস্ট: কবি ও গল্পকার 🖋️

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন