Tuesday, July 21, 2026

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: বাংলাদেশে ফুটবল উন্মাদনায় অন্তত ১২ জনের মৃত্যু, আহত শতাধিক


ছবি: বিশ্বকাপজুড়ে এমন জনসমাগম দেশের ফুটবল উন্মাদনার চিত্র তুলে ধরলেও, একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, দুর্ঘটনা ও সহিংস ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। (সংগৃহীত)

বিশেষ প্রতিবেদন: আরাফাত হাবিব

বিশ্বকাপ মানেই উৎসব। চার বছর অপেক্ষার পর এক মাসের সেই ফুটবল মহাযজ্ঞে ডুবে যায় পুরো পৃথিবী। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। দেশের কোনো দল বিশ্বকাপে খেলে না, তবুও বিশ্বকাপ এলে শহর থেকে গ্রাম—সবখানে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। ছাদে ছাদে উড়ে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন, ইংল্যান্ড কিংবা অন্য প্রিয় দলের বিশাল পতাকা। চায়ের দোকান, ক্লাবঘর, বাজার, মোড় কিংবা খোলা মাঠে বসে রাতভর চলে খেলা দেখা। বিজয়ের আনন্দে মিছিল হয়, পরাজয়ের কষ্টে নেমে আসে হতাশা।

কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ বাংলাদেশের জন্য শুধু ফুটবল উৎসব হয়ে থাকেনি। একের পর এক মৃত্যু, সংঘর্ষ, হামলা, দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, এমনকি খেলা দেখে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাই ও সহিংসতার ঘটনাও এই বিশ্বকাপকে রক্তাক্ত স্মৃতিতে পরিণত করেছে।

দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্বকাপ চলাকালে বাংলাদেশে ফুটবল-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষ, হামলা ও দুর্ঘটনার আরও অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে, যার সবগুলো জাতীয়ভাবে নথিভুক্ত না হলেও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

ফুটবল নিয়ে তর্ক, শেষ হলো জীবনের গল্প

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটে কুমিল্লায়।

আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচ। পুরো দেশ যখন টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখছে, তখন একটি চায়ের দোকানে চলছিল খেলা দেখা। লিওনেল মেসির পেনাল্টি মিস করার পর শুরু হয় কথার লড়াই। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই তর্ক রূপ নেয় হাতাহাতিতে। এরপর সংঘবদ্ধ হামলা।

নিহত হন ৩৮ বছর বয়সী রিকশাচালক মো. শরীফুল ইসলাম। পরিবারের দাবি, তিনি কোনো উগ্র সমর্থক ছিলেন না। ফুটবল নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতে গিয়েই প্রাণ দিতে হয়েছে তাকে। স্ত্রী, দুই কন্যা আর বৃদ্ধ মাকে রেখে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। একটি ফুটবল ম্যাচের ফল বদলে যায়নি, বদলে গেছে একটি পরিবারের পুরো ভবিষ্যৎ।

একটি গোল, একটি পতাকা, একটি জীবন

শুধু কুমিল্লাই নয়। নড়াইল, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, মারামারি, আহত ও প্রাণহানির খবর এসেছে।

কোথাও বিজয় মিছিল নিয়ে সংঘর্ষ, কোথাও পতাকা ছিঁড়ে ফেলা, কোথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্কের জের, আবার কোথাও শুধুমাত্র প্রিয় দলের সমর্থন নিয়ে ব্যক্তিগত বিরোধ রক্তাক্ত পরিণতি ডেকে এনেছে।

বিশ্বকাপের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিনই নতুন নতুন বিশাল পতাকা টাঙানোর প্রতিযোগিতা দেখা যায়। কিন্তু এবার সেই পতাকা টাঙাতেই কয়েকজন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন। বিদ্যুতের তারের ঝুঁকি উপেক্ষা করে উঁচু বাঁশ বা ভবনের ছাদে ওঠার মাশুল দিতে হয়েছে প্রাণ দিয়ে।

খেলা দেখতে গিয়ে আর ঘরে ফেরা হলো না

বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোর বেশিরভাগই বাংলাদেশ সময় গভীর রাতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে রাতভর খেলা দেখে মোটরসাইকেল কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে বাড়ি ফেরার সময়ও ঘটেছে দুর্ঘটনা।

একাধিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির খবর প্রকাশিত হয়েছে। কোথাও মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মৃত্যু, কোথাও দ্রুতগতির গাড়ির ধাক্কায় নিভে গেছে প্রাণ।

শুধু দুর্ঘটনাই নয়, বিভিন্ন জেলায় খেলা দেখে ফেরার পথে হামলা, ছিনতাই ও মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এসব ঘটনায় অনেকেই আহত হন। অনেক ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেল ও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও ওঠে। যদিও এসব ঘটনার সবগুলোতে প্রাণহানি ঘটেনি, তবুও বিশ্বকাপকে ঘিরে রাতের জনসমাগমকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে ওঠার চিত্র সামনে এসেছে।

হাসপাতালেও শেষ রক্ষা হয়নি

চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘ সময় জেগে খেলা দেখা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ এবং আবেগের চরম ওঠানামা হৃদরোগীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশ্বকাপ চলাকালে এমন কয়েকটি মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে খেলা দেখার সময় বা ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকেরা এটিকে সরাসরি ফুটবলের কারণে মৃত্যু না বললেও, অতিরিক্ত উত্তেজনা ও শারীরিক চাপকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিশ্বকাপ শেষ হলেও থামেনি সহিংসতা

বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষ হয়েছে, চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ফুটবলকে ঘিরে উত্তেজনার রেশ এখনো কাটেনি। বরং বিশ্বকাপ-পরবর্তী সময়েও নতুন করে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, যা পরিস্থিতির গভীরতা আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

এরই সর্বশেষ উদাহরণ নারায়ণগঞ্জ। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ফতুল্লার পাগলা এলাকায় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে তর্কের জেরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে ককটেল বিস্ফোরণ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় অন্তত আটজন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দলের সমর্থকদের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিশ্বকাপকে ঘিরে চলমান উত্তেজনাই এ সংঘর্ষের পেছনে প্রধান কারণ।

এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, বিশ্বকাপের ট্রফি বিজয়ী দলের হাতে উঠলেও বাংলাদেশের অনেক এলাকায় সমর্থকদের আবেগ এখনো প্রশমিত হয়নি। চলতি বিশ্বকাপজুড়ে কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, ঝিনাইদহ, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সমর্থকদের সংঘর্ষ, হামলা, সড়ক দুর্ঘটনা এবং অন্যান্য সহিংস ঘটনায় একের পর এক প্রাণহানির খবর এসেছে। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জের ঘটনাটি সেই দীর্ঘ তালিকায় নতুন করে উদ্বেগ যোগ করেছে।

বাংলাদেশ কেন এত আবেগপ্রবণ?

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কোনো দল নেই। তবুও কেন এই উন্মাদনা?

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, কয়েক দশকের সাংস্কৃতিক প্রভাব, টেলিভিশনের বিস্তার, ম্যারাডোনা–পেলে যুগ থেকে তৈরি হওয়া আবেগ এবং পারিবারিকভাবে সমর্থক তৈরি হওয়ার সংস্কৃতি বাংলাদেশে ফুটবলকে শুধু একটি খেলা নয়, সামাজিক পরিচয়ের অংশে পরিণত করেছে।

বাবা আর্জেন্টিনার সমর্থক, ছেলে ব্রাজিলের। এক বাড়ির ছাদে দুই দেশের পতাকা। বন্ধুদের আড্ডায় খুনসুটি। স্বাভাবিক অবস্থায় এগুলো আনন্দেরই অংশ। কিন্তু যখন এই সমর্থন ব্যক্তিগত অহংকার, বিদ্বেষ বা সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন সেটি আর খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্যও বাড়তি চ্যালেঞ্জ

বিশ্বকাপ চলাকালে বিভিন্ন এলাকায় বিজয় মিছিল, গভীর রাত পর্যন্ত জনসমাগম এবং বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, খেলাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সংঘর্ষ, মিছিল বা উসকানিমূলক আচরণ থেকে বিরত থাকার জন্য। কিন্তু তারপরও বিচ্ছিন্নভাবে একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।

একটি আয়না, যেখানে আমরা নিজেদেরই দেখি

বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এই বিশ্বকাপের রেশ এখনো শেষ হয়নি। নারায়ণগঞ্জের সর্বশেষ সংঘর্ষ দেখিয়ে দিচ্ছে, ফুটবলকে ঘিরে অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার সংস্কৃতি এখনো থামেনি। অন্তত ১২ জনের প্রাণহানি, শতাধিক আহত এবং সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জে আরও আটজন আহত হওয়ার ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খেলার সৌন্দর্য তখনই অর্থবহ, যখন তা আনন্দ ও সম্প্রীতির উৎস হয়; বিভেদ ও সহিংসতার নয়। 

বিশ্বকাপের এই ঘটনাগুলো আসলে ফুটবলের গল্প নয়।

এটি আমাদের সামাজিক সহনশীলতার গল্প।

এটি ভিন্ন মত মেনে নিতে না পারার গল্প।

এটি আবেগ নিয়ন্ত্রণ হারানোর গল্প।

যে দেশে বিশ্বকাপে একটি দলও খেলে না, সেই দেশের মানুষ যদি প্রিয় বিদেশি দলকে ঘিরে প্রাণ হারায়, তবে প্রশ্নটা ফুটবলকে নয়, আমাদের নিজেদেরই করতে হবে।

একটি গোল মিস হওয়ার কারণে যদি একজন মানুষ খুন হন, একটি পতাকা টাঙাতে গিয়ে যদি কারও মৃত্যু হয়, কিংবা একটি জয়-পরাজয়ের উল্লাস যদি কোনো শিশুকে এতিম করে দেয়, তাহলে সেটি আর ক্রীড়া-উন্মাদনা থাকে না; সেটি সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। ট্রফি চলে গেছে চ্যাম্পিয়নের হাতে। স্টেডিয়ামের আলো নিভে গেছে অনেক আগেই।

কিন্তু বাংলাদেশের অনেক বাড়িতে এখনও নিভে আছে একটি চিরচেনা মুখের আলো।

হয়তো আগামী বিশ্বকাপেও বাংলাদেশ আবার আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল কিংবা অন্য কোনো দলের পতাকায় রঙিন হবে। কিন্তু সেই উৎসব যেন আর কোনো মায়ের কোল খালি না করে, কোনো শিশুকে বাবাহারা না করে, কোনো পরিবারের জীবনে স্থায়ী শোক বয়ে না আনে, এটাই হোক এবারের বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন