- ১৩ জুলাই, ২০২৬
পিএনএন নিউজ ডেস্ক | আন্তর্জাতিক ক্রীড়া
১৯৬৬ সালের ৩০ জুলাই। লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে তখন প্রায় এক লাখ দর্শকের গর্জন। একদিকে স্বাগতিক ইংল্যান্ড, অন্যদিকে শক্তিশালী পশ্চিম জার্মানি। স্কোর ২–২। খেলা গড়িয়েছে অতিরিক্ত সময়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে জিওফ হার্স্টের নেওয়া একটি শট ক্রসবারে লেগে নিচে পড়ে বাইরে চলে আসে। বলটি গোললাইন পেরিয়েছিল কি না—সেই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আজও তর্ক থামেনি।
কিন্তু রেফারি গোলের বাঁশি বাজান।
সেই একটি সিদ্ধান্ত শুধু ম্যাচের ভাগ্যই বদলায়নি, বদলে দিয়েছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়ের গতিপথ। ইংল্যান্ড শেষ পর্যন্ত ৪–২ ব্যবধানে জিতে প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে। কিন্তু ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের গল্প শুধু সেই বিতর্কিত গোলের নয়। এটি চুরি হওয়া ট্রফির গল্প, ফুটবলের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর একটি, আফ্রিকার প্রতিবাদ, উত্তর কোরিয়ার রূপকথা এবং ইউসেবিও নামের এক অসাধারণ ফুটবলারের বিশ্বজয়ের অসমাপ্ত স্বপ্নের গল্প।
বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক মাস আগেই ইংল্যান্ডজুড়ে সৃষ্টি হয়েছিল এক অদ্ভুত সংকট। লন্ডনের একটি প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছিল বিশ্বকাপের জুলে রিমে ট্রফি। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও একদিন হঠাৎ সেটি চুরি হয়ে যায়। পুরো ব্রিটেনজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তদন্তে নামে, কিন্তু কোনো সূত্র মিলছিল না।
ঠিক এক সপ্তাহ পর অবিশ্বাস্য এক ঘটনা ঘটে।
লন্ডনের দক্ষিণাঞ্চলে হাঁটতে বের হওয়া এক ব্যক্তি লক্ষ্য করেন, তার পোষা কুকুরটি একটি ঝোপের নিচে কাগজে মোড়ানো কিছু শুঁকছে। কাছে গিয়ে দেখা যায়, সেটিই হারিয়ে যাওয়া বিশ্বকাপ ট্রফি। কুকুরটির নাম ছিল পিকলস। মুহূর্তেই সে জাতীয় নায়ক হয়ে ওঠে। সংবাদপত্রের শিরোনাম, টেলিভিশনের অনুষ্ঠান—সবখানেই জায়গা করে নেয় ছোট্ট সেই কুকুর। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই পিকলস হয়ে যায় টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্রগুলোর একটি।
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট ছিল আফ্রিকার প্রতিবাদ। সে সময় বিশ্বকাপে আফ্রিকা, এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলকে একটি মাত্র জায়গার জন্য একসঙ্গে বাছাইপর্ব খেলতে হতো। এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার প্রতিবাদে সব আফ্রিকান দেশ বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে প্রথমবারের মতো কোনো আফ্রিকান দল ছাড়াই শুরু হয় বিশ্বকাপ। পরে এই আন্দোলনের ফলেই ফিফা আফ্রিকার জন্য আলাদা বিশ্বকাপ কোটা বরাদ্দ দিতে বাধ্য হয়।
ইংল্যান্ডের মাটিতে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে ১৬টি দল অংশ নেয়। শিরোপার অন্যতম দাবিদার ছিল ব্রাজিল। দুইবারের টানা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটির নেতৃত্বে ছিলেন পেলে। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এবারও হয়তো ব্রাজিলের আধিপত্যই দেখা যাবে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গ্রুপপর্বেই পর্তুগালের বিপক্ষে নির্মম ফাউলের শিকার হন পেলে। সেই সময় বদলি খেলোয়াড় নামানোর নিয়ম ছিল না। ফলে চোট নিয়েই মাঠে থাকতে হয় তাকে। পরের ম্যাচেও একই অবস্থা। প্রতিপক্ষের একের পর এক কঠিন ট্যাকলের সামনে কার্যত অসহায় হয়ে পড়েন বিশ্বের সেরা ফুটবলার। শেষ পর্যন্ত গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নেয় ব্রাজিল। পরে পেলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তিনি আর কখনো বিশ্বকাপ খেলবেন না। যদিও পরে সেই সিদ্ধান্ত বদলে ১৯৭০ সালে ইতিহাস গড়েন তিনি।
এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের জন্ম দেয় উত্তর কোরিয়া।
প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া এশিয়ার ছোট্ট দেশটি শুরুতে কাউকেই ভয় পায়নি। গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি। প্রায় সবাই ইতালির সহজ জয় ধরে নিয়েছিল। কিন্তু ৪২ মিনিটে পাক দু-ইকের একমাত্র গোলে ১–০ ব্যবধানে জিতে ইতিহাস গড়ে উত্তর কোরিয়া। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর একটি হিসেবে আজও স্মরণ করা হয় সেই ম্যাচকে। ইতালির বিদায়ের খবরে পুরো ফুটবল বিশ্ব হতবাক হয়ে গিয়েছিল।
কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তর কোরিয়ার সামনে ছিল পর্তুগাল।
ম্যাচের শুরুতেই আরও বড় বিস্ময়। মাত্র ২৫ মিনিটের মধ্যে উত্তর কোরিয়া ৩–০ গোলে এগিয়ে যায়। গুডিসন পার্কে উপস্থিত দর্শকেরা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, আরেকটি অঘটন বুঝি ঘটতে যাচ্ছে।
কিন্তু তারপর শুরু হয় ইউসেবিওর জাদু।
একাই চারটি গোল করেন তিনি। দুইবার পেনাল্টি থেকে, দুটি দুর্দান্ত আক্রমণ থেকে। পরে হোসে অগুস্তোর আরেকটি গোলে পর্তুগাল ৫–৩ ব্যবধানে জয় পায়। বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রত্যাবর্তনের নায়ক হয়ে ওঠেন ইউসেবিও। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি করেন ৯ গোল, যা তাকে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার এনে দেয়। অনেকের মতে, বিশ্বকাপে এটি ছিল সর্বকালের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স।
অন্যদিকে স্বাগতিক ইংল্যান্ড ধীরে ধীরে নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছিল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন অধিনায়ক ববি মুর। মাঝমাঠে ববি চার্লটনের অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ, রজার হান্টের গোল করার ক্ষমতা এবং গর্ডন ব্যাংকসের নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষণ ইংল্যান্ডকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
কোয়ার্টার ফাইনালে তারা হারায় আর্জেন্টিনাকে। তবে ম্যাচটি ছিল বিতর্কে ভরা। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে লাল কার্ড দেখানো হলে তিনি মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। কয়েক মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। সেই ঘটনা পরবর্তীতে রেফারিদের ক্ষমতা ও শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে।
সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ছিল ইউসেবিওর পর্তুগাল। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা ইউসেবিওকে আটকে রাখাই ছিল ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ববি চার্লটনের জোড়া গোলে ইংল্যান্ড এগিয়ে যায়। শেষদিকে ইউসেবিও পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করলেও ২–১ ব্যবধানে জিতে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে স্বাগতিকরা। ম্যাচ শেষে ইউসেবিওকে মাঠে কাঁদতে দেখা যায়। সেই ছবি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
৩০ জুলাই ওয়েম্বলিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে প্রথমে এগিয়ে যায় পশ্চিম জার্মানি। তবে দ্রুতই সমতা ফেরান জিওফ হার্স্ট। পরে মার্টিন পিটার্সের গোলে ইংল্যান্ড এগিয়ে গেলেও ম্যাচের ৮৯ মিনিটে ভলফগ্যাং ভেবারের গোলে সমতা ফেরায় জার্মানি। নির্ধারিত সময় শেষে স্কোর দাঁড়ায় ২–২।
অতিরিক্ত সময়ের সেই বহুল আলোচিত মুহূর্ত আসে ১০১ মিনিটে। জিওফ হার্স্টের শট ক্রসবারে লেগে নিচে পড়ে বাইরে আসে। সহকারী রেফারির সঙ্গে আলোচনা করে মূল রেফারি গোলের সিদ্ধান্ত দেন। আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত গোলগুলোর তালিকায় এটি শীর্ষে রয়েছে। জার্মানদের দাবি ছিল বল পুরোপুরি গোললাইন অতিক্রম করেনি। ইংল্যান্ডের দাবি, গোলটি বৈধ ছিল।
তর্ক-বিতর্কের মাঝেই ম্যাচের শেষ দিকে আরও একটি গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন হার্স্ট। বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করা প্রথম ফুটবলার হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন তিনি। ধারাভাষ্যকার কেনেথ ওলস্টেনহোমের সেই বিখ্যাত বাক্য—"ওরা ভাবছে খেলা শেষ... এখন সত্যিই শেষ!"—আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় ধারাভাষ্যগুলোর একটি।
শেষ বাঁশি বাজার পর ওয়েম্বলি উৎসবে ফেটে পড়ে। অধিনায়ক ববি মুরের হাতে জুলে রিমে ট্রফি তুলে দেন ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। সেই ছবিটি আজও ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গর্বের প্রতীক।
প্রায় ছয় দশক পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ১৯৬৬ সালের সেই বিকেল আজও ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় স্মৃতি। এরপর একাধিকবার বিশ্বকাপ খেলেছে ইংল্যান্ড, সেমিফাইনাল ও ফাইনালের দুয়ারে পৌঁছেছে, কিন্তু আর কখনো জুলে রিমে কিংবা বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলার সুযোগ পায়নি। তাই ওয়েম্বলির সেই জয় আজও ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে। আর জিওফ হার্স্টের বিতর্কিত সেই গোল, পিকলসের উদ্ধার করা ট্রফি, ইউসেবিওর অশ্রু কিংবা উত্তর কোরিয়ার অবিশ্বাস্য জয়—সব মিলিয়ে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ আজও ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় আসরগুলোর একটি।
এবার ইতিহাস যেন আবারও ইংল্যান্ডের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে পুরোনো এক প্রতিপক্ষকে। প্রায় ৬০ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। সামনে সেমিফাইনাল। প্রশ্ন একটাই—১৯৬৬ সালের মতো কি আবারও আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে পারবে ইংল্যান্ড? ওয়েম্বলির সেই সোনালি ইতিহাস কি আবারও নতুন করে লেখা হবে? নাকি লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা থামিয়ে দেবে ইংলিশদের স্বপ্ন? উত্তর মিলবে মাঠে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, ১৯৬৬ সালের সেই অমর ইতিহাস নতুন করে আলোচনায় ফিরেছে, আর ফুটবল বিশ্ব অপেক্ষা করছে—ইংল্যান্ড কি আবারও ইতিহাস লিখতে পারবে?