Monday, July 13, 2026

বিধ্বস্ত চিলি থেকে ব্রাজিলের অমরত্ব: যে বিশ্বকাপে পেলের বদলে ইতিহাস লিখেছিলেন গ্যারিঞ্চা


ছবিঃ ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে খেলার সময় একজন ব্রাজিলীয় খেলোয়াড় বলের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছেন (সংগৃহীত)

বিশেষ প্রতিবেদনঃ আরাফাত হাবিব

১৯৬২ সালের ১৭ জুন। চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোর নাসিওনাল স্টেডিয়ামে তখন হাজারো দর্শকের উল্লাস। চার বছর আগে সুইডেনে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতেছিল ব্রাজিল। এবার তারা শিরোপা ধরে রাখার লড়াইয়ে। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই দলের সবচেয়ে বড় তারকা পেলে মাঠের বাইরে। অনেকের ধারণা ছিল, পেলের অনুপস্থিতিতে ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের স্বপ্নও শেষ হয়ে গেছে।

কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে কিছু বিশ্বকাপ থাকে, যেগুলো একজন তারকার নয়, একটি দলের গল্প হয়ে ওঠে। ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপ ঠিক তেমনই একটি আসর। এটি ছিল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি দেশের বিশ্বকে চমকে দেওয়ার গল্প, সহিংসতার জন্য সমালোচিত এক টুর্নামেন্টের গল্প, আর একই সঙ্গে এমন একজন ফুটবলারের গল্প, যিনি পেলের ছায়ায় থেকেও বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তিনি নিজেও একজন কিংবদন্তি। সেই ফুটবলারের নাম গ্যারিঞ্চা।

বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র দুই বছর আগে, ১৯৬০ সালের মে মাসে চিলিতে আঘাত হানে ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৫। পুরো শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, হাজারো মানুষ প্রাণ হারান, লাখো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। তখন অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, চিলির পক্ষে বিশ্বকাপ আয়োজন করা সম্ভব নয়।

কিন্তু চিলির সংগঠকরা একটি বাক্য দিয়ে পুরো বিশ্বকে চমকে দেন। তারা বলেছিলেন, "আমাদের কিছুই নেই, তাই আমাদের সবকিছুই গড়ে তুলতে হবে।" সেই সংকল্প থেকেই সীমিত অবকাঠামো নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করা হয়। কয়েকটি নির্ধারিত ভেন্যু বাদ দেওয়া হয়, চারটি শহরকে কেন্দ্র করে বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে এই বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের নয়, চিলির জাতীয় পুনর্জাগরণের প্রতীক হয়ে ওঠে। 

টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগেই শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার ছিল ব্রাজিল। চার বছর আগের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটির তারকার তালিকা ছিল ঈর্ষণীয় পেলে, গ্যারিঞ্চা, দিদি, ভাভা, জাগালো, জিলমার, মাউরো প্রতিটি নামই তখন বিশ্ব ফুটবলের পরিচিত মুখ। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের গোলরক্ষক লেভ ইয়াশিন, চেকোস্লোভাকিয়া, যুগোস্লাভিয়া, হাঙ্গেরি এবং স্বাগতিক চিলিও ছিল শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ম্যাচেই সব হিসাব পাল্টে যায়।

চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে খেলতে গিয়ে উরুর পেশিতে চোট পান পেলে। ম্যাচ শেষ করলেও পরে জানা যায়, তিনি আর পুরো টুর্নামেন্টে খেলতে পারবেন না। মাত্র ২১ বছর বয়সী পেলের বিশ্বকাপ কার্যত সেখানেই শেষ হয়ে যায়। ব্রাজিলজুড়ে নেমে আসে হতাশা। যে দলকে বিশ্বসেরা বলা হচ্ছিল, তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্রই আর মাঠে নেই।  ঠিক সেই সময় সামনে এগিয়ে আসেন গ্যারিঞ্চা।

তার আসল নাম মানোয়েল ফ্রান্সিসকো দোস সান্তোস। জন্ম থেকেই তার দুই পা ছিল অস্বাভাবিক। একটি পা অন্যটির চেয়ে ছোট, হাঁটুও ছিল বাঁকা। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন, তিনি হয়তো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেই পারবেন না। অথচ সেই মানুষটিই বল পায়ে এমন সব ড্রিবল করতেন, যা দেখে বিশ্বের সেরা রক্ষণভাগও দিশেহারা হয়ে যেত। ব্রাজিলে তাকে বলা হতো "জনগণের আনন্দ"।

গ্রুপপর্বে পেলের জায়গায় দলে আসেন আমারিলদো। স্পেনের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ব্রাজিল পিছিয়ে পড়ার পর তিনিই জোড়া গোল করে দলকে জয় এনে দেন। কিন্তু সেই ম্যাচে পুরো আক্রমণের প্রাণ ছিলেন গ্যারিঞ্চা। তার ড্রিবলিং আর সৃজনশীল আক্রমণে ব্রাজিল বুঝিয়ে দেয়, তারা শুধু একজন খেলোয়াড়ের দল নয়।

কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। ম্যাচের শুরু থেকেই গ্যারিঞ্চা যেন অন্য এক ছন্দে খেলছিলেন। কর্নার থেকে উঠে এসে হেডে গোল, দূরপাল্লার বাঁকানো শট থেকে আরেক গোল, আরও একটি গোলে অবদান একাই ইংল্যান্ডকে বিধ্বস্ত করেন তিনি। ব্রাজিল ৩–১ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রাও স্বীকার করেছিলেন, সেদিন গ্যারিঞ্চাকে থামানোর কোনো উপায় তাদের জানা ছিল না।  এই বিশ্বকাপে মাঠের ফুটবলের পাশাপাশি আলোচনায় ছিল এক ভয়াবহ ম্যাচ।

স্বাগতিক চিলি ও ইতালির গ্রুপপর্বের লড়াই পরে ইতিহাসে "সান্তিয়াগোর যুদ্ধ" নামে পরিচিত হয়। ম্যাচের আগেই কয়েকজন ইতালীয় সাংবাদিক চিলিকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন। তার জের মাঠেও গড়ায়। শুরু থেকেই একের পর এক মারামারি, ঘুষি, লাথি, ধাক্কাধাক্কি এক পর্যায়ে পুলিশকে মাঠে ঢুকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। দুই ইতালীয় খেলোয়াড় বহিষ্কৃত হন। এই ম্যাচের পরই ইংল্যান্ডের রেফারি কেন অ্যাস্টন উপলব্ধি করেন, সতর্কবার্তা ও বহিষ্কার বোঝাতে দৃশ্যমান কোনো সংকেত থাকা দরকার। পরবর্তীতে তার ভাবনা থেকেই ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ড ব্যবস্থার ধারণার জন্ম হয়, যা কয়েক বছর পর বিশ্ব ফুটবলে চালু হয়।

অন্যদিকে স্বাগতিক চিলি পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ফুটবল খেলছিল। ইতালিকে হারানোর পর তারা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন সোভিয়েত ইউনিয়নকেও বিদায় করে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে ওঠে। পুরো দেশ তখন স্বপ্ন দেখছিল, হয়তো নিজের মাটিতেই বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব। কিন্তু সেমিফাইনালে তাদের সামনে ছিল গ্যারিঞ্চা।

সান্তিয়াগোর নাসিওনাল স্টেডিয়ামে প্রায় ৭৭ হাজার দর্শকের সামনে গ্যারিঞ্চা আবারও দুই গোল করেন। পুরো ম্যাচজুড়ে স্বাগতিকদের রক্ষণভাগকে নাস্তানাবুদ করেন তিনি। চিলির একটি সংবাদপত্র পরদিন শিরোনাম করেছিল "গ্যারিঞ্চা, তুমি কোন গ্রহ থেকে এসেছ?" তবে ম্যাচের শেষ দিকে একটি ঘটনায় তিনি মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। অনেকেই ভেবেছিলেন, লাল কার্ডের কারণে তিনি আর ফাইনাল খেলতে পারবেন না। কিন্তু পরে শাস্তি স্থগিত হওয়ায় তিনি ফাইনালে খেলার সুযোগ পান। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে। 

ফাইনালে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ ছিল চেকোস্লোভাকিয়া। ম্যাচের ১৫ মিনিটের মাথায় মাসোপুস্তের গোলে এগিয়ে যায় ইউরোপের দলটি। মুহূর্তের জন্য স্টেডিয়ামে নেমে আসে নীরবতা। তবে ব্রাজিলের জবাব আসতে সময় লাগেনি।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমারিলদো সমতা ফেরান। দ্বিতীয়ার্ধে জিতোর গোলে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। ম্যাচের শেষদিকে ভাভা আরেকটি গোল করলে ৩–১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ফাইনালে গ্যারিঞ্চা পুরোপুরি ফিট ছিলেন না। তবু দলের অভিজ্ঞতা, ভারসাম্য এবং আত্মবিশ্বাস ব্রাজিলকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এনে দেয়।

এই বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার লড়াইও ছিল ব্যতিক্রমী। ছয়জন ফুটবলার চারটি করে গোল করে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার মর্যাদা পান। তাদের মধ্যে ছিলেন গ্যারিঞ্চা, ভাভা, লিওনেল সানচেস, ফ্লোরিয়ান আলবার্ট, দ্রাজান ইয়েরকোভিচ এবং ভ্যালেন্তিন ইভানভ। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এমন ঘটনা আর কখনও ঘটেনি।

চিলি বিশ্বকাপের আরেকটি স্মরণীয় ঘটনা ছিল কলম্বিয়ার মার্কোস কোলের করা একটি অলিম্পিক গোল। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে কর্নার থেকেই সরাসরি গোল করেছিলেন তিনি। আজও সেটিই বিশ্বকাপ ইতিহাসে একমাত্র অলিম্পিক গোল হিসেবে রয়ে গেছে।

আজ ছয় দশকেরও বেশি সময় পর ফিরে তাকালে ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপকে শুধু ব্রাজিলের টানা দ্বিতীয় শিরোপার গল্প বলে শেষ করা যায় না। এটি ছিল এমন একটি টুর্নামেন্ট, যেখানে একটি বিধ্বস্ত দেশ বিশ্বকে সফল আয়োজন উপহার দিয়েছিল। যেখানে পেলের চোটে থেমে যায়নি ব্রাজিল, বরং গ্যারিঞ্চা প্রমাণ করেছিলেন একজন কিংবদন্তির অনুপস্থিতিতেও আরেকজন কিংবদন্তি ইতিহাস লিখতে পারেন।

ফুটবল ইতিহাসে ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপ তাই শুধু একটি ট্রফির গল্প নয়। এটি সাহসের গল্প, পুনর্জন্মের গল্প এবং এমন এক ফুটবলারের গল্প, যিনি হয়তো পেলের মতো তিনটি বিশ্বকাপ জেতেননি, কিন্তু এক বিশ্বকাপে নিজের কাঁধে পুরো একটি দেশকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছিলেন। আর সেই কারণেই অনেক ফুটবল ইতিহাসবিদের কাছে চিলির সেই বিশ্বকাপ আজও পরিচিত "গ্যারিঞ্চার বিশ্বকাপ"। 



Super Admin

PNN

প্লিজ লগইন পোস্টে মন্তব্য করুন!

আপনিও পছন্দ করতে পারেন