- ১২ জুলাই, ২০২৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক। PNN
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় দফা হামলার পর ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে তেহরান।
রোববার ইরান জানিয়েছে, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান, কাতার ও ওমানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়েছে। তেহরানের দাবি, দক্ষিণাঞ্চলীয় ইরানের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার জবাব হিসেবেই এই পাল্টা অভিযান চালানো হয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছিল, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নজরদারি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল বেসামরিক জাহাজ ও বাণিজ্যিক নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, “একতরফা চুক্তির যুগ শেষ হয়েছে।” তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, নতুবা এর পরিণতি ভোগ করতে হবে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এখন চরমে পৌঁছেছে। ইরান এই জলপথ বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। তেহরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই অঞ্চলে ইরানের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জ্বালানি পরিবহন রুট। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের বড় একটি অংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে দীর্ঘ সময় এ পথ বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, ওমানের দুকম বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরবরাহ ও জ্বালানি সহায়তা ব্যবস্থায় হামলা চালানো হয়েছে। কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবিও করেছে তেহরান।
তবে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ইরানের ছোড়া হামলা প্রতিহত করেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলা প্রতিহত করার সময় ছিটকে আসা ধ্বংসাবশেষে তিনজন আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া কুয়েতে থাকা মার্কিন প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোলাবারুদ সংরক্ষণাগার ও রাডার স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। বাহরাইনে মার্কিন যোগাযোগ ব্যবস্থা ও রাডার স্থাপনা এবং জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে হামলার দাবিও করেছে আইআরজিসি।
ইরানের হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলো সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। কয়েকটি দেশে বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বাজানো হয় এবং নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ওমান জানিয়েছে, দেশের নিরাপত্তা ও নাগরিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
কাতার ইরানের হামলাকে নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে। দেশটি জানিয়েছে, এ ধরনের হামলা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়াবে এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে।
কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা শত্রু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। বাহরাইনেও নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এখন সরাসরি উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। এর আগে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে আলোচনা চললেও, সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলায় সেই প্রক্রিয়া কার্যত ভেঙে পড়ার পথে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘটনা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহল নতুন করে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছে।